ডায়াবেটিস রোগ ও খাদ্য

নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস : ইনসুলিনের লুকোচুরি ও আধুনিক জীবনযাপনের চড়া মাশুল

ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের নীরব মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি এমন একটি রোগ যা একবারে নিরাময় হয় না, তবে সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে একে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

মূল কারিগর: অগ্ন্যাশয় ও ইনসুলিনের রসায়ন

এই রোগের মূল কারণ বুঝতে হলে আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ‘অগ্ন্যাশয়’ (Pancreas) এবং এর থেকে নিঃসৃত হরমোন ‘ইনসুলিন’-এর কাজ সম্পর্কে জানতে হবে।

আমরা প্রতিদিন যে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাই, তা পরিপাকতন্ত্রে ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং রক্তে মিশে যায়। অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ (Beta Cells) থেকে তৈরি হওয়া ইনসুলিন হরমোন কোষে গ্লুকোজ প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি ‘চাবি’-র মতো কাজ করে। কোষের গায়ে থাকা তালায় এই চাবি লাগলেই কোষের দরজা খুলে যায় এবং রক্তের গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ইনসুলিন ছাড়া গ্লুকোজ কোনোভাবেই কোষে ঢুকতে পারে না।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’-এর ফাঁদ

রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো এই ইনসুলিনের ঘাটতি অথবা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে না পারা। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে প্রধানত যা ঘটে, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ বা ইনসুলিন প্রতিরোধ।

এক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করলেও শরীরের কোষগুলো সেই ইনসুলিনকে চিনতে পারে না বা গ্রহণ করতে চায় না। অর্থাৎ, চাবি ঠিক থাকলেও কোষের তালা বিকল হয়ে যায়। ফলে গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে না পেরে রক্তেই জমতে থাকে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়।

অগ্ন্যাশয়ের ক্লান্তি: রক্তে অতিরিক্ত শর্করার চাপ সামলাতে অগ্ন্যাশয় আরও বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে বাধ্য হয়। এভাবে অনবরত অতিরিক্ত কাজ করতে করতে একসময় অগ্ন্যাশয়ের কোষগুলো ক্লান্ত হয়ে ধ্বংস হতে শুরু করে এবং শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন স্থায়ীভাবে কমে যায়।

নেপথ্যের অপরাধী: অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন

ইনসুলিনের এই স্বাভাবিক কাজে বাধা দেওয়ার পেছনে বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় অপরাধী হলো আমাদের আধুনিক ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টিজাতীয় খাবার, প্রক্রিয়াজাত শর্করা (Fast Food/Processed Carb) গ্রহণ এবং কায়িক শ্রম বা শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রাথমিক সতর্ক সংকেত ও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

ডায়াবেটিস শরীরে বাসা বাঁধার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক লক্ষণ দেখা দেয়, যা অবহেলা করা একদমই উচিত নয়:

  • ঘন ঘন প্রস্রাব ও তীব্র তৃষ্ণা: রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ জমা হলে কিডনি তা ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয় এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড তৃষ্ণা পায় ও মুখ শুকিয়ে আসে।

  • তীব্র ক্লান্তি ও দুর্বলতা: যেহেতু গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে শক্তি উৎপাদন করতে পারে না, তাই শরীর আক্ষরিক অর্থেই শক্তির অভাবে বা অনাহারে ভোগে। ফলে সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভূত হয়।

  • ঝাপসা দৃষ্টি: রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করলে চোখের লেন্সের ভেতরে তরলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে লেন্স ফুলে যায়, যার কারণে রোগীর দৃষ্টি সাময়িকভাবে ঝাপসা হয়ে আসে।

অবহেলার পরিণতি: ভয়াবহ অঙ্গহানি ও মৃত্যুর ঝুঁকি

দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের প্রধান অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে মূলত ৩টি বড় ধরনের জটিলতা দেখা দেয়:

১. ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি: উচ্চ শর্করার কারণে কিডনি বিকল বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

২. ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি: শরীরের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হাত-পায়ে অনুভূতি কমে যায় বা সার্বক্ষণিক জ্বালাপোড়া হতে থাকে।

৩. হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক: ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তনালীতে চর্বি জমার প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। ফলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:

ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে হলে বা একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে খাদ্যাভ্যাস থেকে অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট কায়িক শ্রম বা হাঁটার অভ্যাস করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অপরিহার্য। প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ামাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে রক্ত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

admin

আলামিন মিয়া, একজন ব্লগার, ডিজিটাল মার্কেটার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার। ব্লগিংকরছি প্রায় ৭ বছর যাবৎ। বিভিন্ন অনলাইন সেবা হাতের কাছে পেতে নির্দেশনা ও পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করা হয় যা আপনি খুব সহজেই এই ওয়েবসাইট হতে পেতে পারেন। যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য প্রয়োজন হয় বা পরামর্শ থাকে তবে মেইল করুন admin@tricksboss.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *