ডায়াবেটিসে পায়ের যত্নে অবহেলা নয়: ছোট ক্ষত থেকেই হতে পারে বড় জটিলতা
ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি রোগ। তবে অনেক রোগী রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের দিকে যতটা মনোযোগ দেন, পায়ের যত্নের বিষয়টি ততটা গুরুত্ব দেন না। চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিসের কারণে স্নায়ু ও রক্তনালির ক্ষতি হলে পায়ের বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে আলসার, গুরুতর সংক্রমণ এমনকি অঙ্গহানির কারণও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে পায়ের স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমে যায়। ফলে পায়ে কাটা, ফোস্কা, আঘাত বা ক্ষত সৃষ্টি হলেও অনেক সময় রোগীরা তা অনুভব করতে পারেন না। একই সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ায় ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কেন ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের যত্ন জরুরি?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি (Diabetic Neuropathy) ডায়াবেটিসজনিত অন্যতম সাধারণ জটিলতা। এ অবস্থায় পায়ের অনুভূতি কমে যাওয়ায় রোগীরা ক্ষত বা আঘাত সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন না।
এছাড়া রক্তনালির ক্ষতির কারণে পায়ে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে ক্ষত দ্রুত শুকায় না এবং সামান্য সমস্যাও ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ে আলসার হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। যথাসময়ে চিকিৎসা না নিলে এসব আলসার সংক্রমিত হয়ে পায়ের আঙুল বা পা কেটে ফেলার মতো পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে।
পায়ের যত্নে যা করবেন
ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিদিন পায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পায়ে কোনো কাটা, ফোস্কা, ফাটল, লালচে দাগ বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পা সবসময় পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে হবে। গোসলের পর আঙুলের ফাঁক ভালোভাবে মুছে নিতে হবে যাতে আর্দ্রতার কারণে ছত্রাক বা সংক্রমণ না হয়।
নখ কাটার ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। নখ সোজাভাবে কাটতে হবে এবং খুব গভীর করে কাটা যাবে না। এতে ইনগ্রোন নখ বা ত্বকে আঘাতের ঝুঁকি কমে।
চিকিৎসকরা খালি পায়ে হাঁটার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। বাড়ির ভেতরেও স্যান্ডেল বা সুরক্ষিত পাদুকা ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি আরামদায়ক ও সঠিক মাপের জুতা পরলে পায়ে চাপ বা ঘর্ষণজনিত ক্ষতি কম হয়।
পায়ের ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে আঙুলের ফাঁকে ক্রিম ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ অতিরিক্ত আর্দ্রতা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পায়ে কোনো ক্ষত, ঘা বা ফোস্কা দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। এছাড়া পা ফুলে যাওয়া, লালচে বা কালচে রং ধারণ করা, পুঁজ বা দুর্গন্ধ বের হওয়া এবং অসাড়তা বা জ্বালাপোড়া বেড়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণই প্রধান প্রতিরোধ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসজনিত পায়ের জটিলতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং দৈনন্দিন পায়ের যত্নের মাধ্যমে অধিকাংশ জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—পায়ের ছোট কোনো সমস্যা অবহেলা করা যাবে না। কারণ সামান্য ক্ষতও সময়মতো যত্ন না পেলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের রুটিনে পায়ের যত্নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

