ডায়াবেটিসে হাত-পা ঝিনঝিন ও অবশ ভাব: ক্যালসিয়ামের ভূমিকা এবং প্রতিকারে করণীয়
ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে হাত-পা চিবানো, কামড়ানো, ঝিনঝিন করা কিংবা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা বেশ সাধারণ। অনেকেই এই লক্ষণগুলোকে কেবলই ডায়াবেটিসের জটিলতা মনে করলেও, এর পেছনে অন্যতম একটি প্রধান কারণ হতে পারে শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি। চিকিৎসকদের মতে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ক্যালসিয়ামের অভাব হলে স্নায়ু এবং পেশির কার্যকারিতা ব্যাহত হয়, যা হাত-পা অবশ বা ঝিনঝিন করার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে এবং এই অস্বস্তিকর সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে দৈনিক জীবনযাত্রা ও খাদ্যতালিকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
১. ক্যালসিয়াম ঘাটতি পূরণে সাপ্লিমেন্ট
শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রার ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট (Calcium Supplement) গ্রহণ করা উচিত। এটি দ্রুত ঘাটতি পূরণ করে হাড় ও স্নায়ুকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। তবে যেকোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই ডায়াবেটোলজিস্ট বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
২. প্রাকৃতিক উপায়ে ভিটামিন-ডি ও ক্যালসিয়ামের সমন্বয়
সূর্যের আলো: শরীর যাতে খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম সঠিকভাবে শোষণ করতে পারে, তার জন্য ভিটামিন-ডি অপরিহার্য। আর ভিটামিন-ডি এর সবচেয়ে বড় উৎস হলো সূর্যালোক। তাই প্রতিদিন সকালের মিষ্টি রোদে ১০-১৫ মিনিট শরীর লাগানো উচিত।
খালি পায়ে ঘাসে হাঁটা: প্রতিদিন সকালে নিয়মিত খালি পায়ে সবুজ ঘাসের ওপর হাঁটার অভ্যাস করা ভালো। এটি পায়ের রক্ত সঞ্চালন (Blood Circulation) বৃদ্ধি করে এবং স্নায়ুর উদ্দীপনা বাড়াতে সাহায্য করে, যা ঝিনঝিন ভাব কমাতে সহায়ক।
৩. ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ আদর্শ খাদ্যতালিকা
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে প্রাকৃতিকভাবেই ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দূর করা সম্ভব। ডায়াবেটিস রোগীরা তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নিচের খাবারগুলো রাখতে পারেন:
দুগ্ধজাত খাবার: টকদই এবং পনির ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস। বিশেষ করে টকদই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী, কারণ এটি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে।
ডিম: ডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি, যা পেশির দুর্বলতা দূর করে।
নানা পদের পুষ্টিকর বীজ: চিয়াবীজ (Chia seeds), তিসিবীজ (Flax seeds), সাদা তিল, কুমড়ার বীজ এবং সূর্যমুখী বীজ ক্যালসিয়ামের পাওয়ার হাউস হিসেবে পরিচিত। এগুলো নিয়মিত সালাদ, ওটস বা টকদইয়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়া যায়।
বাদাম: কাঠবাদাম (Almond) বা বিভিন্ন ধরণের চিনা বাদামে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকে, যা স্নায়ুর স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
মাছ: সামুদ্রিক মাছ এবং ছোট দেশীয় মাছ (বিশেষ করে কাঁটাসহ চিবিয়ে খাওয়া যায় এমন মাছ) ক্যালসিয়ামের বড় উৎস। এছাড়া সামুদ্রিক মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড স্নায়ুর প্রদাহ কমায়।
সবুজ শাকসবজি: পালং শাক, ব্রোকলি, লাল শাক, কলমি শাকসহ সব ধরণের সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও আঁশ (Fiber) থাকে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।
বিশেষ সতর্কবার্তা: ডায়াবেটিস রোগীদের হাত-পা অবশ বা ঝিনঝিন করার পেছনে ‘ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি’ (স্নায়ুর ক্ষতি) অন্যতম কারণ হতে পারে। তাই ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক।

