জোটসঙ্গী থেকে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে আন্দালিব রহমান পার্থ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটের শরিক দল থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে এবার সরকারের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্বে এলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ও রদবদলের অংশ হিসেবে তিনি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে মন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ান।
পার্থের মন্ত্রী হওয়া শুধু মন্ত্রিসভায় নতুন একটি নাম যুক্ত হওয়ার ঘটনা নয়; এর মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটে দীর্ঘদিনের শরিক হিসেবে থাকা একটি দলের চেয়ারম্যান সরাসরি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী কাঠামোর অংশ হলেন। একই সঙ্গে এটি তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেরও একটি উল্লেখযোগ্য নতুন অধ্যায়।
২০০৮ সালে জোটের প্রার্থী, এবার পূর্ণমন্ত্রী
আন্দালিব রহমান পার্থের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় উত্থান ঘটে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সে সময় চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচন করে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বর্জন করলে পার্থও সংসদের বাইরে চলে যান। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ আসনে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে সে নির্বাচনে তিনি জয় পাননি।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও ভোলা-১ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হন পার্থ। নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৩৩৭ ভোট। ফলে প্রায় এক যুগের বেশি সময় পর ভোলা-১ আসন থেকে আবার সংসদে ফিরে আসেন তিনি।
অর্থাৎ, ২০০৮ সালে যে আসন থেকে জোটের শরিক হিসেবে প্রথমবার সংসদে প্রবেশ করেছিলেন, প্রায় ১৮ বছর পর সেই ভোলা-১ থেকেই দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য হয়ে এবার সরাসরি মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেন তিনি।
সংসদে ফেরার পরও সক্রিয় ছিলেন পার্থ
২০২৬ সালে সংসদে ফিরে আসার পর পার্থকে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় দায়িত্বও দেওয়া হয়। জুন মাসে তাকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় কমিটিটি গঠন করা হয়।
এ দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয়তার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। পাশাপাশি তিনি পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও নির্বাচিত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
জাতীয় সংসদে বিভিন্ন ইস্যুতেও পার্থকে সরব দেখা গেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের সময়কার দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে তিনি সংসদে বক্তব্য দেন।
জোটের শরিক থেকে সরকারের অংশীদার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছোট বা মাঝারি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জোট রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আন্দালিব রহমান পার্থের রাজনৈতিক পথচলাতেও সেই জোট রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন জোটে বিজেপির অবস্থান এবং পার্থের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোটের সমর্থনে ভোলা-১ আসনে তাঁর জয় সেই রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও দৃঢ় করে।
নির্বাচনের আগে ভোলা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যেও পার্থ স্থানীয় উন্নয়ন, গ্যাসের ব্যবহার, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
এবার মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার ফলে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা আর শুধু একটি জোটসঙ্গী দলের চেয়ারম্যান বা সংসদ সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ, গণমাধ্যম, সরকারি প্রচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় তথ্যপ্রবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এখন তাঁর দায়িত্বের আওতায় আসছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সরকারের অন্যতম স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক, সরকারি তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কার্যক্রম, চলচ্চিত্র ও সম্প্রচার নীতিমালা এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির জনসম্মুখে উপস্থাপনের সঙ্গে এ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সরাসরি সম্পৃক্ত।
ফলে নতুন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে পার্থের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ থাকবে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তিত একটি সময়ে সরকারের তথ্যপ্রবাহকে কতটা স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও জনবান্ধব করা যায়—সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের সুযোগ, সাংবাদিকদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্য ও অপতথ্য মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রত্যাশা থাকবে।
পার্থ নিজে আইনজীবী এবং দীর্ঘদিনের রাজনীতিক হওয়ায় তাঁর আইন ও রাজনীতির অভিজ্ঞতা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে কতটা কাজে লাগে, সেটিও এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
এক আসন থেকে দুইবার সংসদ, এবার মন্ত্রিসভায়
পার্থের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে ভোলা-১ আসনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য হন তিনি। এরপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে ২০২৬ সালে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে একই আসনে আবারও জয়ী হয়েছেন।
এই প্রত্যাবর্তনের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও এক ধাপ ওপরে উঠল। প্রথমে সংসদ সদস্য, এরপর গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং এখন পূর্ণমন্ত্রী—স্বল্প সময়ের মধ্যে দায়িত্বের এই ধারাবাহিক পরিবর্তন তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষ করে জোটের শরিক দলের একজন নেতা হিসেবে সরকারের মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হওয়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের জোট ব্যবস্থাপনার দিকটিও সামনে এনেছে। এতে সরকার পরিচালনায় মিত্র দলগুলোর অংশগ্রহণ আরও দৃশ্যমান হলো।
রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে নতুন পরীক্ষা
আন্দালিব রহমান পার্থ রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা প্রয়াত নাজিউর রহমান মঞ্জু ছিলেন রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ফলে রাজনীতির পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা এবং দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও তিনি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করেছেন। সংসদে বক্তব্য, জোট রাজনীতিতে সক্রিয়তা এবং নিজের দলের নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি এখন স্বতন্ত্র।
নতুন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সেই পরিচিতিকে আরও বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। কারণ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয় নয়; এখানে নীতি, প্রশাসন, গণমাধ্যম, জনমত এবং সরকারের ভাবমূর্তি—সবকিছুর সমন্বয় করতে হয়।
সামনে কী করতে পারেন পার্থ?
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কাছে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার প্রত্যাশা থাকবে। সরকারি তথ্য জনগণের কাছে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়া, গণমাধ্যমবান্ধব পরিবেশ তৈরি, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে আরও কার্যকর করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপতথ্য মোকাবিলা—এসবই তাঁর মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
এর পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও সংস্কার কার্যক্রম জনগণের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে নতুন সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময়ে তথ্যের স্বচ্ছতা এবং নির্ভরযোগ্যতা সরকারের প্রতি জনআস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সব মিলিয়ে, ২০০৮ সালে জোটের শরিক দলের প্রার্থী হিসেবে ভোলা-১ থেকে সংসদে প্রবেশ করা আন্দালিব রহমান পার্থ ২০২৬ সালে একই আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য হয়ে এবার সরকারের তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে পৌঁছেছেন। তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর একটি। এখন দেখার বিষয়, জোটের রাজনীতি থেকে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উঠে আসা পার্থ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আইনজীবীসত্তার কতটা কার্যকর প্রয়োগ করতে পারেন।

