খাজনা বকেয়া থাকলে কি জমি বিক্রি করা যাবে? ২০২৬ সালের নিয়মে যা জানা জরুরি
জমির খাজনা বা বর্তমান পরিভাষায় ভূমি উন্নয়ন কর নিয়মিত পরিশোধ না করলে জমি বিক্রি করা যাবে কি না—এ প্রশ্ন এখন অনেক জমির মালিক ও ক্রেতার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন খাজনা পরিশোধ না করা, দাখিলা হালনাগাদ না থাকা কিংবা নামজারির জটিলতার কারণে জমি কেনাবেচার সময় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।
আইন ও সরকারি ভূমি-তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া থাকলেই জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না এবং কেবল বকেয়ার কারণে জমি বিক্রির অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়—এমন সাধারণ বিধান নেই। তবে বকেয়া কর, জরিমানা, নামজারি, দাখিলা এবং জমির ওপর কোনো সরকারি আদায় কার্যক্রম বা মামলা আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই ছাড়া জমি বিক্রি বা কেনা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
খাজনা নয়, এখন ভূমি উন্নয়ন কর
বাংলাদেশে জমির খাজনাকে আইনগতভাবে এখন ভূমি উন্নয়ন কর বলা হয়। এ বিষয়ে বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ কার্যকর রয়েছে। আইনটি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে কার্যকর করা হয় এবং এটি পার্বত্য তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান—ব্যতীত সমগ্র বাংলাদেশে প্রযোজ্য।
সাধারণ মানুষের কাছে এখনো ‘খাজনা’ শব্দটি বেশি পরিচিত হলেও সরকারি সেবা ও আইনি নথিতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিভাষাটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের পর জমির মালিক দাখিলা পান। এই দাখিলা জমির মালিকানা ও ভোগদখলের ধারাবাহিকতা প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং নামজারি ও জমি কেনাবেচাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন হতে পারে।
কখন খাজনা বকেয়া হিসেবে গণ্য হবে?
ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী, কোনো বছরের ভূমি উন্নয়ন কর সংশ্লিষ্ট বছরের ৩০ জুনের মধ্যে পরিশোধ না করা হলে তা বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর হিসেবে বিবেচিত হবে।
অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর পরিশোধ না করলে জমির হিসাব থেকে বকেয়া সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এক বছরের কর বকেয়া হওয়া আর দীর্ঘ সময় ধরে কর পরিশোধ না করা এক বিষয় নয়। বকেয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত আর্থিক দায় এবং আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে কী হবে?
আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী, কোনো ভূমি মালিক একটানা তিন বছর ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ না করলে প্রথম বছর থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত বকেয়া করের সঙ্গে বার্ষিক ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে জরিমানা যুক্ত করে তা আদায়যোগ্য হবে।
তৃতীয় বছর শেষে বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের জন্য Public Demands Recovery Act, 1913-এর বিধান অনুসারে সার্টিফিকেট মামলা রুজু করে আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এ কারণে বহু বছরের খাজনা বকেয়া রেখে জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জমিটির প্রকৃত সরকারি অবস্থা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে খাজনা বকেয়া থাকলে জমি বিক্রি করা সম্ভব?
এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর থাকলেই জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বকেয়া খাজনা থাকা অবস্থায় নিশ্চিন্তে জমি বিক্রি করা যাবে বা ক্রেতা কোনো ঝুঁকিতে থাকবেন না।
জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, নামজারি, খতিয়ান, দাগ নম্বর, পূর্ববর্তী দলিল, দখল এবং হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি ভূমি-সংক্রান্ত নির্দেশনায় জমি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় দলিল, দখল, দাখিলা এবং খতিয়ানের তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ না করলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
অর্থাৎ বাস্তব চিত্র কী?
জমি বিক্রির আগে খাজনা বকেয়া থাকলে সাধারণত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি—
প্রথমত: জমিটির বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর কত বছরের এবং কত টাকা।
দ্বিতীয়ত: বকেয়া করকে কেন্দ্র করে কোনো সার্টিফিকেট মামলা বা সরকারি আদায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি না।
তৃতীয়ত: জমির নামজারি ও ভূমি রেকর্ড বর্তমান মালিকের নামে সঠিকভাবে হালনাগাদ আছে কি না।
এই বিষয়গুলো পরিষ্কার না করে জমি বিক্রি করলে পরবর্তীতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই জটিলতায় পড়তে পারেন।
হালনাগাদ দাখিলা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দাখিলা জমির মালিকানার একমাত্র দলিল নয়। জমির মালিকানা নির্ধারণে দলিল, উত্তরাধিকার, আদালতের আদেশ, রেকর্ড, নামজারি এবং অন্যান্য প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা জমির ভোগদখল ও সরকারি রেকর্ডের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর সেবার তথ্যেও বলা হয়েছে, কর পরিশোধের পর পাওয়া দাখিলা জমির নামজারি বা কেনাবেচাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে।
এ কারণে জমি বিক্রির সময় অনেক ক্রেতাই সর্বশেষ দাখিলা দেখতে চান।
বিক্রেতার করণীয় কী?
যে ব্যক্তি জমি বিক্রি করতে চান, তাঁর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো বিক্রির আগেই জমির কাগজপত্র হালনাগাদ করা।
১. বকেয়া খাজনার হিসাব যাচাই
প্রথমে দেখতে হবে জমির কত বছরের ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া রয়েছে। পুরোনো হোল্ডিং, দাখিলা বা অনলাইন ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য ব্যবহার করে এ হিসাব যাচাই করা যেতে পারে।
২. বকেয়া কর ও জরিমানা পরিশোধ
যদি বকেয়া থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী কর ও প্রযোজ্য জরিমানা পরিশোধ করা উচিত।
বিশেষ করে তিন বছর বা তার বেশি সময়ের বকেয়া থাকলে সরকারি অফিসে জমির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা জরুরি।
৩. হালনাগাদ দাখিলা সংগ্রহ
কর পরিশোধের পর নতুন দাখিলা সংগ্রহ করে জমির কাগজপত্রের সঙ্গে সংরক্ষণ করা উচিত।
সরকারি অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থায় হোল্ডিং নিবন্ধনের জন্য সচল মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং দাখিলা বা খারিজ খতিয়ানের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।
৪. নামজারি ঠিক আছে কি না নিশ্চিত করুন
অনেক ক্ষেত্রে জমি কেনার পর দলিল করা হলেও নামজারি সম্পন্ন করা হয় না। ফলে ভূমি উন্নয়ন কর, দাখিলা ও সরকারি রেকর্ডের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জমি বিক্রির আগে বর্তমান মালিকের নামে নামজারি ও রেকর্ডের অবস্থা যাচাই করা জরুরি।
৫. মামলা বা সরকারি জটিলতা আছে কি না খোঁজ নিন
দীর্ঘদিনের বকেয়া থাকলে শুধু করের পরিমাণ জানলেই যথেষ্ট নয়। জমিটি নিয়ে কোনো সার্টিফিকেট মামলা, সরকারি দাবি বা অন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ আছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।
ক্রেতাদের জন্য বড় সতর্কতা
জমি কেনার আগে শুধু বিক্রেতার হাতে থাকা দলিল দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
ক্রেতার উচিত—
- সর্বশেষ দলিল যাচাই করা;
- পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা দেখা;
- নামজারি খতিয়ান পরীক্ষা করা;
- দাগ, খতিয়ান ও মৌজার তথ্য মিলিয়ে দেখা;
- হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা পরীক্ষা করা;
- জমির দখল বাস্তবে কার কাছে রয়েছে তা দেখা;
- জমির ওপর কোনো মামলা, বন্ধক বা সরকারি দাবি আছে কি না যাচাই করা।
সরকারি ভূমি-তথ্যে জমি কেনাবেচার সময় দলিল, দখল, দাখিলা এবং খতিয়ানের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষিজমির ক্ষেত্রে কর মওকুফ হলেও দাখিলা গুরুত্বপূর্ণ
ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এ নির্দিষ্ট শর্তে কিছু কৃষিজমি ভূমি উন্নয়ন কর থেকে মওকুফের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী মওকুফপ্রাপ্ত কৃষিজমির ক্ষেত্রেও ভোগদখলের প্রমাণপত্র রাখার স্বার্থে নির্ধারিত ব্যবস্থায় মওকুফ দাখিলা দেওয়া যেতে পারে।
তাই ‘আমার জমির কর লাগে না’—এই যুক্তিতে কোনো ধরনের দাখিলা বা সরকারি তথ্য হালনাগাদ না রাখলে পরবর্তীতে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের সুযোগ
সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর সেবার মাধ্যমে অনলাইনে হোল্ডিং নিবন্ধন, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান এবং দাখিলা-সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যায়। সরকারি পোর্টালে কর পরিশোধের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্দেশিকা ও সাধারণ জিজ্ঞাসার উত্তরও দেওয়া রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া থাকলে জমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিক্রির অযোগ্য হয়ে যায়—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। আবার বকেয়া রেখেই জমি বিক্রি করলে কোনো সমস্যা হবে না—এমন ধারণাও নিরাপদ নয়।
কারণ বকেয়ার পরিমাণ, কত বছর ধরে বকেয়া রয়েছে, জরিমানা হয়েছে কি না, সার্টিফিকেট মামলা হয়েছে কি না এবং জমির নামজারি ও মালিকানা রেকর্ড কী অবস্থায় আছে—এসবের ওপর পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের জায়গায় যা সবচেয়ে জরুরি
জমি বিক্রির আগে বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে হালনাগাদ দাখিলা সংগ্রহ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
আর জমি কেনার আগে ক্রেতার উচিত শুধু দাখিলা নয়, দলিল, নামজারি, খতিয়ান, দখল এবং সম্ভাব্য মামলা বা সরকারি দাবির বিষয়ও যাচাই করা।
জমি নিয়ে সামান্য অসতর্কতাও পরবর্তীতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও দীর্ঘ আইনি বিরোধের কারণ হতে পারে। তাই বকেয়া খাজনাসহ কোনো জমি কেনাবেচার আগে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়, ভূমি অফিস এবং প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর মাধ্যমে নথিপত্র যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
[সংবাদটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত। নির্দিষ্ট জমির মামলা, বকেয়া বা মালিকানা পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।]

