ডায়াবেটিস রোগ ও খাদ্য

হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথম ৫ মিনিটে কী করবেন—জীবন বাঁচাতে যে পদক্ষেপগুলো জরুরি

হার্ট অ্যাটাক এমন একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি, যেখানে কয়েক মিনিটের দেরিও হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বুকের চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঝিমঝিম করা কিংবা ব্যথা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে এটিকে সাধারণ গ্যাস বা বদহজম ভেবে অপেক্ষা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি সচেতনতামূলক পোস্টারে হার্ট অ্যাটাকের প্রথম পাঁচ মিনিটে পাঁচটি করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। পোস্টারটির মূল বক্তব্য হলো—লক্ষণ চিনে দ্রুত জরুরি নম্বরে ফোন করা, উপযুক্ত ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন নেওয়া, নিজে গাড়ি না চালানো এবং চিকিৎসা পেতে এক মুহূর্তও অযথা দেরি না করা। তবে পোস্টারের তথ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশনা মিলিয়ে দেখলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আরও পরিষ্কার হয়।

প্রথমেই বুঝতে হবে—কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত

হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা বা অস্বস্তি। এই অস্বস্তি কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে, আবার কমে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসতেও পারে। ব্যথা বা অস্বস্তি এক বা দুই হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা পেটের ওপরের অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঝিমঝিম করা কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতাও থাকতে পারে।

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বুকের ব্যথার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, পিঠ বা কাঁধে ব্যথা এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো তুলনামূলক কম প্রচলিত লক্ষণও দেখা যেতে পারে। তাই শুধু তীব্র বুকব্যথার অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়।

১. প্রথম কাজ—জরুরি সেবায় ফোন করুন

হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো জরুরি চিকিৎসা সহায়তা চাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের American Heart Association-এর নির্দেশনায় বুকব্যথা বা হার্ট অ্যাটাকের অন্যান্য লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা সক্রিয় করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা যায়। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৯৯৯-এর মাধ্যমে জরুরি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়া যায় এবং সেবাটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে।

অর্থাৎ পোস্টারে থাকা ‘৯১১’ নম্বরটি বাংলাদেশের জন্য নয়। বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করতে হবে।

২. অ্যাসপিরিন—সবার জন্য নয়, তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উপকারী হতে পারে

হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহে অ্যাসপিরিন নিয়ে পোস্টারে যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সেটি পুরোপুরি ভুল নয়; তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে।

American Heart Association ও American Red Cross-এর ২০২৪ সালের ফার্স্ট-এইড নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হার্ট অ্যাটাকের মতো অ-আঘাতজনিত তীব্র বুকব্যথায় সচেতন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ডাকার পর ১৬২–৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে গিলে নেওয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে, যদি তার অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি না থাকে এবং চিকিৎসক আগে থেকে অ্যাসপিরিন না নিতে বলে না থাকেন।

NHS-ও হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহে অপেক্ষার সময় ৩০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে, তবে অ্যালার্জি থাকলে তা না নিতে বলেছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অ্যাসপিরিন খেয়ে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া বিলম্ব করা যাবে না। American Heart Association স্পষ্টভাবে বলছে, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে আগে জরুরি সহায়তা ডাকতে হবে; অ্যাসপিরিন খেয়ে তার প্রভাব দেখার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়।

যাদের অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি আছে, রক্তপাতের ঝুঁকি রয়েছে বা চিকিৎসক আগে থেকেই অ্যাসপিরিন নিষেধ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাবেন না

হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করলে মাঝপথে শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যবহার করাই নিরাপদ।

American Heart Association বলছে, বুকব্যথা বা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে EMS-এর মাধ্যমে হাসপাতালে যাওয়ার সুবিধা হলো—জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাথমিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসা শুরু করতে পারেন এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন।

তাই সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত ও আরামদায়ক অবস্থায় রাখা উচিত।

৪. অপেক্ষার সময় রোগীকে নিরাপদ অবস্থায় রাখুন

হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অযথা হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি ওঠানামা বা শারীরিক পরিশ্রম করতে দেওয়া উচিত নয়। NHS-এর নির্দেশনায় অ্যাম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত আরামদায়কভাবে বসে বা হেলান দিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ সময় রোগীর অবস্থা নজরে রাখতে হবে। তিনি সাড়া দিচ্ছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না—সেটিও খেয়াল করা জরুরি।

৫. রোগী অচেতন হয়ে গেলে পরিস্থিতি বদলে যাবে

হার্ট অ্যাটাক এবং হঠাৎ হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়। হার্ট অ্যাটাকে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়; অন্যদিকে cardiac arrest হলে হৃদ্‌যন্ত্র কার্যকরভাবে স্পন্দন বন্ধ করে দেয়। তবে হার্ট অ্যাটাক থেকে cardiac arrest হতে পারে।

আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে দ্রুত জরুরি সহায়তা ডাকতে হবে এবং প্রশিক্ষণ থাকলে CPR শুরু করতে হবে। কাছাকাছি AED থাকলে সেটিও ব্যবহার করার ব্যবস্থা করতে হবে।

‘প্রথম ৫ মিনিট’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

হার্ট অ্যাটাকে হৃদ্‌যন্ত্রের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ কমে বা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অক্সিজেনের অভাবে হৃদ্‌পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। যত দ্রুত রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের চিকিৎসা শুরু করা যায়, তত বেশি হৃদ্‌পেশি রক্ষা করার সুযোগ থাকে।

এই কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। ‘কিছুক্ষণ দেখি’, ‘গ্যাসের ওষুধ খেয়ে দেখি’ বা ‘ব্যথা নিজে থেকেই চলে যাবে’—এ ধরনের অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সহজে মনে রাখার নিয়ম

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে পাঁচটি বিষয় মনে রাখা যেতে পারে—

লক্ষণ চিনুন → ৯৯৯-এ ফোন করুন → নিরাপদে বিশ্রাম নিন → উপযুক্ত হলে অ্যাসপিরিন বিবেচনা করুন → নিজে গাড়ি চালাবেন না।

বাংলাদেশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ দেশের যেকোনো স্থান থেকে জরুরি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সহায়তার জন্য ফোন করা যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এটি ২৪ ঘণ্টা চালু এবং বিনামূল্যে কল করা যায়।

সবচেয়ে বড় ভুল—লক্ষণকে অবহেলা করা

হার্ট অ্যাটাক সবসময় সিনেমার মতো তীব্র বুকব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। কারও ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অস্বস্তি শুরু হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে বুকের অস্বস্তি কমে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসতে পারে।

তাই বুকের অস্বাভাবিক চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঝিমঝিম বা শরীরের ওপরের অংশে ব্যথা দেখা দিলে এটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—অ্যাসপিরিন, গ্যাসের ওষুধ বা ঘরোয়া কোনো পদ্ধতি জরুরি চিকিৎসার বিকল্প নয়। হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সময় নষ্ট না করাই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বিশেষ সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ থাকলে অনলাইনে পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে জরুরি চিকিৎসা নিন। অ্যাসপিরিন নেওয়ার ক্ষেত্রেও অ্যালার্জি, রক্তপাতের ঝুঁকি ও চিকিৎসকের পূর্বনির্দেশের বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।

admin

আলামিন মিয়া, একজন ব্লগার, ডিজিটাল মার্কেটার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার। ব্লগিংকরছি প্রায় ৭ বছর যাবৎ। বিভিন্ন অনলাইন সেবা হাতের কাছে পেতে নির্দেশনা ও পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করা হয় যা আপনি খুব সহজেই এই ওয়েবসাইট হতে পেতে পারেন। যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য প্রয়োজন হয় বা পরামর্শ থাকে তবে মেইল করুন admin@tricksboss.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *