দেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত: পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তরে উন্নীত ‘লিগ্যাল এইড’
দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের আইনি সুরক্ষার একমাত্র ভরসা ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ এখন থেকে পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেছে। সম্প্রতি সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারির মাধ্যমে সংস্থাটিকে ‘বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি আইনি সেবা আরও শক্তিশালী ও গতিশীল হবে।
কেন এই রূপান্তর?
২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি একজন নির্বাহী পরিচালকের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে ক্রমবর্ধমান মামলার চাপ এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন ছিল।
প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি: অধিদপ্তর হওয়ায় এখন এটি নিজস্ব নিয়োগ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন পাবে।
কাঠামোগত বিস্তার: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে লিগ্যাল এইড অফিসারদের কার্যক্রম তদারকি এবং সেবার মানোন্নয়নে অধিদপ্তর সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবে।
জনবল কাঠামো: নতুন এই রূপান্তরের ফলে অধিদপ্তরের অধীনে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা মামলা জট কমাতে সহায়ক হবে।
গেজেট ও আইনি ভিত্তি
২০২৬ সালের শুরুতেই রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশে জারিকৃত অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে: ১. সরকার অবিলম্বে ‘বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করবে। ২. পূর্বের সংস্থার সকল সম্পদ, কর্মচারী এবং চলমান কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই অধিদপ্তরের অধীনে ন্যস্ত হবে। ৩. অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকাতে এবং প্রয়োজনে সারা দেশে শাখা কার্যালয় স্থাপন করা যাবে।
অধিদপ্তরের নতুন ও বর্ধিত কার্যাবলি
নতুন আইন অনুযায়ী, অধিদপ্তরের কাজের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে:
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): আদালতের বাইরে সমঝোতার (Mediation) মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর প্রক্রিয়াকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী সহায়তা: প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দিতে বিভিন্ন দূতাবাসে ‘লিগ্যাল এইড অফিসার’ পদায়নের সুপারিশ করবে এই অধিদপ্তর।
সনদ প্রদান: পেশাদার মধ্যস্থতাকারী (Mediator) তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের ক্ষমতা এখন অধিদপ্তরের হাতে।
তদারকি: বেসরকারি সংস্থাগুলো যারা আইনগত সহায়তা দিচ্ছে, তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও এলাকা নির্ধারণেও অধিদপ্তর ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন
অধিদপ্তরের কার্যক্রম তদারকি ও নীতিনির্ধারণের জন্য ১৫ সদস্যের একটি ‘জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠিত হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা/মন্ত্রী এই পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ এই পরিষদের সদস্য হিসেবে থাকবেন।
বিশেষ তথ্য: বর্তমানে অসহায় বিচারপ্রার্থীরা ১৬৬৯৯ (টোল-ফ্রি) নম্বরে কল করে সরাসরি আইনি পরামর্শ ও সহায়তা গ্রহণ করতে পারছেন। অধিদপ্তর হওয়ায় এই হেল্পলাইনের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
উপসংহার: বিচারিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠায় এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর এখন থেকে কেবল পরামর্শ কেন্দ্র নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার মূল কারিগর হিসেবে কাজ করবে।


