গীবত কি? কোরআন ও হাদিসের আলোকে গীবতের কি নির্দেশনা আছে

কোরআন ও হাদিসের আলোকে গীবতের ব্যাখ্যা

 ১. গবিত কী? বা গীবত অর্থ

গীবত আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ পরনিন্দা, দোষারোপ করা, অনুপস্থিত থাকা, পরোক্ষে নিন্দা, পরচর্চা করা, কুৎসা রটনা করা, পিছনে সমালোচনা করা। অন্যের দোষ ত্রুটি প্রকাশ করা, কুৎসা রটনা করা, পিছে সমালোচনা করা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় গীবত বলতে বুঝায় কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বালা যা শুনলে সে তা অপছন্দ করবে।গীবত করার মাধ্যম চোখের ইশারায়, অঙ্গভঙ্গিতে, শ্রবণে ও লিখনে গীবত পরনিন্দা কেবল মুখের বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং চোখের ইশারায়, অঙ্গভঙ্গিতে, শ্রবণে ও লিখনের দ্বারাও গীবত হয়ে থাকে। সর্বপ্রকার গীবতই হারাম। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা বলেন, একদিন আমি হাতের ইশারায় এক স্ত্রীলোককে খর্বাকৃতি বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে আয়েশা। তুমি গীবত করেছ, থুথু ফেলো। তৎক্ষণাৎ আমি থুথু ফেলে দেখলাম তা কালো বর্ণের জমাট রক্ত। এরূপে কোনো খোঁড়া কিংবা টেরা চক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা অনুকরণ করার জন্য খুঁড়িয়ে হেঁটে কিংবা চক্ষু টেরা করে চাইলে তার গীবত করা হলো তবে কারো নাম উল্লেখ না করলে এতে গীবত হয় না। কিন্তু উপস্থিত লোকেরা যদি বুঝতে পারে যে অমুক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে তবে তা গীবত বলে গণ্য এবং হারাম হবে।ইবাদতের ত্রুটি বিচ্যুতির উল্লেখপূর্বক সমালোচনা।

২. কারা কারা গীবতের অন্তর্ভুক্ত

যেমন অমুক ব্যক্তি উত্তম রূপে নামাজ পড়ে না অথবা রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে না অথবা নফল নামাজ পড়ে না অথবা রমজানের সবগুলো রোজা রাখে না অথবা মাকরুহ্ ওয়াক্তে নামাজ পড়ে। তাহাজ্জুদের ওয়াক্তে কতক ঘুমিয়ে থাকলে শেখ সাদী (রা.) তাদের সমালোচনা করেন এবং বলেন, এই লোকগুলো যদি তাহাজ্জুদ পড়তো তবে কতই না ভাল হত। সাদীর পিতা একথা শুনে বলেন, কতই না ভাল হত যদি তুমি তাহাজ্জুদ না পড়ে এদের মত ঘুমিয়ে থাকতে। তাহলে এদের গীবত করার পাপ তোমার ঘাড়ে চাপত না।

কোন ব্যক্তি অভিনয়ের মাধ্যমে অপর ব্যক্তির দোষ ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত করলে তাও গীবতের অন্তর্ভূক্ত।গীবত করার কারণ বা মানুষ যে সব ক্ষেত্রে গীবত করে থাকেঃমানুষ সব সময় নিজেকে বড় করে দেখে, এই আমিত্বের আরেক নাম আত্মপূজা। এটা শুরু হয়ে গেলে আত্মপ্রীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন তার আত্মত্যাগের মতো মহৎ বৈশিষ্ট্য দূরিভূত হতে থাকে। ফলে এ স্থানে দানা বাঁধে হিংসা বিদ্বেষ। আবার হিংসা বিদ্বেষ থেকেই অপরের প্রতি কুধারণার সৃষ্টি হয়, যা মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে। সুতরাং আত্মপূজা, আত্মপ্রীতি, হিংসাবিদ্বেষ, কুধারণাই মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে।

৩. ইমাম গায্‌যালী তার রচিত কিতাব কিমিয়ায়ে সাআদাত গ্রহন্থে ৮টি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন

১. ক্রদ্ধ হওয়া।

২. অপরের মনতুষ্টি কামানায়।

৩. নিজের দোষ অপরের ঘাড়ে চাপানোর প্রবনতায়।

৪. আত্ম প্রশংসার স্পৃহা।

৫. ঈর্ষা পরায়ন হয়ে।

৬. হাসি-বিদ্রুপ।

৭. অসাবধনাতয়। যেমন কানা বাবু, তোতলা কাশেম ইত্যাদি।

৮. আত্মাভিমান।

৪. গীবতের পরিণাম  কি?

গীবত ইসলামি শরিয়তে হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়। সূরা হুমাজাহ -১

কেয়ামতের দিন নিজের মুখ নিজের নখ দ্বারা জখম করবে  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মিরাজের সময় আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখমণ্ডল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরীল আ কে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নিজ ভাইদের গীবত করত ও ইজ্জতহানি করত। মাজহারি হযরত আনাস রা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মিরাজের রাতে আমি এমন একদল লোককে অতিক্রম করলাম যারা নিজেদের নখ দ্বারা নিজেদের মুখমন্ডল ক্ষতবিক্ষত করছিল। আমি জিবরাঈল (আ)কে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তিনি বলেন, এসব লোক গীবত করতো এবং মানুষের ইজ্জত আব্রু নিয়ে টানাটানি করতো।

৫. গীবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক

হাদীস শরীফে গীবতকে ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন গীবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এটা কিরূপে? তিনি বললেন, এক ব্যক্তিব্যভিচার করার পর খাঁটি তওবা করলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়, কিন্তু যে গীবত করে তার গুনাহ গীবতকৃত ব্যক্তি মাফ নাকরা পর্যন্ত মাফ হয় না। হাদীসটি হযরত আবু সায়ীদ রা ও জাবের রা বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হল,গীবতের মাধ্যমে আল্লহতায়ালার হক ও বান্দার হক উভয়ই নষ্ট করা হয়। তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন।

৬. কবর আযাব হবে গীবত কারিরা

হযরত জাবির রা বলেন, আমরা মহানবী (সা.) এর সাথে সফরে ছিলাম। তিনি দুটি কবরের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং কবরেরবা সিন্দাদ্বয়কে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। মহানবী (সা.) বলেনঃ তারা দুজন খুব মারাত্মক কোন গোনাহ করেনি, অথচ তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তাদের একজন মানুষের গীবত করত এবং অপরজন পেশাব করে উত্তমরূপে পবিত্র হত না। অতপর তিনি গাছের দুটি তাজা ডাল চেয়ে নিয়ে তা দুভাগ করে দুজনের কবরের পাশে গেড়ে দেন এবং বলেন, ডাল দুটি যতক্ষণ তরতাজা থাকবে ততক্ষণ তাদের হাল্কা শাস্তি হবে।

৭. কোন ব্যক্তিকে তার গুনাহের কারণে অপদস্ত করা এবং তাকে জাহান্নামী মনে করা আল্লাহ তায়ালার মর্জি বিরোধী কাজ। বরং যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে অপমান করে আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং তাকে অপমান করেন, অন্যদিকে যাকে অপমান করা হলো তার গুনাহ্ মাফ করে দেন। বনী ইসরাঈলের দুই ব্যক্তির ঘটনা এভাবে উল্লেখিত হয়েছে যে, তাদের একজন সর্বদা ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকতো এবং অপরজন পাপাচারে লিপ্ত থাকতো। ইবাদতে লিপ্ত ব্যক্তি সব সময় পাপাচারীকে হেয় প্রতিপন্ন করতো। একদিন সে চটে গিয়ে বলল, আল্লাহর শপথ তুমি জাহান্নামে যাবে। কথাটি আল্লাহ্ পাকের অপছন্দ হলো এবং ইবাদতে লিপ্ত ব্যক্তিকে জাহান্নামী এবং পাপীকে জান্নাতী বানিয়ে দিলেন আবু দাউদ, কিতাবুল বিররি ওয়াস মিলাহ।

৮. গীবত করার পরে করণীয়

যার গীবত করা হয়েছে যদি সেই ব্যক্তি জীবিত থাকে এবং সম্ভব হয় তবে তার নিকট মাফ চেয়ে নিতে হবে। আর যদি সে জীবিত না থাকে কিংবা সে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে তবে তার গুনাহ্ মাপের জন্য আল্লাহ্র নিকট দুআ করতে হবে এবং নিজের জন্যও দুয়া করতে হবে।

১. গীবত করা কবীরাহ গুনাহ

২. পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়।

৩. সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

৪. পরকালে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।শেষ কথা সুতরাং মানব সমাজের এই পার্থক্য সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার নিমিত্তেই। যেসব কারণে সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট হয়, সমাজ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়, সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো গীবত, যা মানুষকে নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত করে। তাই তো মহান আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এই নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে বিরত থাকার তাগিদ দিয়েছেন।আমাদের সব সময় আল্লাহতায়ালার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে তিনি যেন অনুগ্রহ করে গীবতের মতো জঘন্য সামাজিক ব্যাধিতে আমাদের নিমজ্জিত হতে না দেন। এ ক্ষেত্রে জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সর্বাগ্রে। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বান্দা যখন ভোরে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় তখন শরীরের সব অঙ্গ জিহ্বার কাছে আরজ করে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহর নাফরমানি কাজে পরিচালিত করো না। কেননা, তুমি যদি ঠিক থাক, তবে আমরা সঠিক পথে থাকব। কিন্তু যদি তুমি বাঁকা পথে চলো, তবে আমরাও বাঁকা হয়ে যাবো। তিরমিজি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার জন্য তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো।-বুখারি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *