ডায়াবেটিসে পায়ে জ্বালাপোড়া ও ঝিনঝিনি: কেন হয় এবং কীভাবে বাঁচবেন?
ডায়াবেটিস কেবল রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয় না, এটি নীরবে শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় পায়ের স্নায়ু বা নার্ভ। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকেই অভিযোগ করেন—পায়ে তীব্র জ্বালাপোড়া, ঝিনঝিনি করা, কিংবা সুঁই ফোটার মতো অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই জটিলতাকে বলা হয় ‘ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি’ (Diabetic Neuropathy)।
দীর্ঘদিন রক্তে সুগারের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কেন এই সমস্যা তৈরি হয় এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কেন পায়ে এই জ্বালা বা ঝিনঝিনি হয়?
১. নার্ভ বা স্নায়ুর ক্ষতি (Diabetic Neuropathy): দীর্ঘদিন ধরে রক্তে সুগারের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে তা শরীরের স্নায়ুগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২. রক্ত চলাচলে বাধা: অতিরিক্ত সুগার স্নায়ুতে রক্ত সরবরাহকারী সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে স্নায়ুগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না এবং নার্ভগুলো ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। ৩. পায়ে আগে লক্ষণ দেখার কারণ: মানুষের শরীরের সবচেয়ে লম্বা স্নায়ুগুলো পা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দীর্ঘ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল নার্ভগুলোই ডায়াবেটিসের কারণে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই সমস্যার সূত্রপাত সাধারণত পা থেকেই হয়। ৪. রাতে প্রকোপ বৃদ্ধি: চিকিৎসকদের মতে, দিনের বেলা নানা কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকার কারণে এই অস্বস্তি অতটা টের পাওয়া না গেলেও, রাতে বা বিশ্রামের সময় এই জ্বালাপোড়া ও ঝিনঝিনির অনুভূতি অনেক বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।
অনুভূতি কমে যাওয়া: একটি নীরব বিপদ
এই সমস্যাটি যদি প্রাথমিক অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে একপর্যায়ে পায়ের অনুভূতি সম্পূর্ণ কমে যেতে পারে। অনুভূতিহীনতা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে পায়ে কোনো স্থানে কেটে গেলে, ছোপ খেলে বা ফোস্কা পড়লে রোগী তা টের পান না। এই ছোটখাটো ক্ষত থেকে পরবর্তীতে ইনফেকশন বা পচন (Gangrene) ধরতে পারে, যা এমনকি পা কেটে ফেলার মতো পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিকার: কী করলে কমবে এই সমস্যা?
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক জীবনযাত্রা ও সচেতনতার মাধ্যমে এই কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
রক্তে সুগার কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা: এই সমস্যার মূল কারণ যেহেতু অতিরিক্ত সুগার, তাই নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করে এবং খাদ্য তালিকা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হবে।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও হাঁটাচলা: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিয়ম করে হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন। এটি পায়ে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে, যা স্নায়ুর কর্মক্ষমতা সচল রাখে।
পায়ের বিশেষ যত্ন (Foot Care): প্রতিদিন কুসুম গরম পানি ও মৃদু সাবান দিয়ে পা ধুয়ে নরম কাপড় দিয়ে মুছে শুকিয়ে রাখুন। পায়ে কোনো কাটাছেঁড়া, ফোস্কা বা ক্ষত তৈরি হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করুন। খালি পায়ে হাঁটা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং আরামদায়ক নরম জুতো ব্যবহার করতে হবে।
ডাক্তারের পরামর্শ ও ওষুধ: যদি জ্বালাপোড়া বা ঝিনঝিনির মাত্রা তীব্র হয়, তবে ঘরে বসে না থেকে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকরা নার্ভের কার্যক্ষমতা সচল রাখতে ও ব্যথা কমাতে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ (যেমন: ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স বা বিশেষ পেইন কিলার) দিয়ে থাকেন।
বিশেষজ্ঞের শেষ কথা: ডায়াবেটিসে পায়ের যেকোনো সমস্যাকে অবহেলা করা মানে বড় বিপদকে ডেকে আনা। পায়ে সামান্যতম অস্বাভাবিক অনুভূতি দেখা দিলেই সচেতন হোন এবং সুস্থ জীবনযাপনের নিয়মগুলো মেনে চলুন।

