ডিজিটাল যুগেও কাটেনি ভীতি: ভূমি অফিসে যাওয়ার আগে মানুষ কেন এখনও পকেট চেক করে?
“ভূমি অফিসে ঢুকেই কেন মানুষ পকেট চেক করে?”—প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে কৌতুকপূর্ণ মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে দেশের কোটি মানুষের এক দীর্ঘ ও তিক্ত বাস্তবতার গল্প। যেকোনো নাগরিকের জন্য ভূমি অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি মানেই ফাইলের কাগজের চেয়ে পকেটের মানিব্যাগটা একটু বেশি ভারী আছে কি না, তা নিশ্চিত করা। সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একটি অলিখিত নিয়ম যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে—ভূমি অফিস মানেই বাড়তি খরচ, দালালের দৌরাত্ম্য, অহেতুক হয়রানি আর টেবিলের নিচ দিয়ে “কিছু একটা” দেওয়া।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, এই ভীতি কি শুধুই বছরের পর বছর ধরে চলে আসা কোনো নেতিবাচক প্রচারণার ফল, নাকি এখনও প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা?
ডিজিটাল বিপ্লব বনাম মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা
গত কয়েক বছরে দেশের ভূমি সেবা খাতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ রূপকল্পের আওতায় ভূমি মন্ত্রণালয় নাগরিক সেবা হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।
ই-নামজারি (e-Mutation): এখন ঘরে বসেই নামজারির আবেদন করা যাচ্ছে।
অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর: লাইনে না দাঁড়িয়েই ডিজিটাল উপায়ে দেওয়া যাচ্ছে খাজনা।
স্মার্ট খতিয়ান: মাত্র কয়েক ক্লিকেই মিলছে পরচা বা খতিয়ানের কপি।
সরকারি তথ্য মতে, এই অনলাইন সেবার ফলে কোটি কোটি মানুষের ভোগান্তি কমেছে এবং মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের প্রভাব অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তথ্যের এই ডিজিটালাইজেশন অবশ্যই একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
তাহলে ভয় কাটছে না কেন?
ডিজিটাল সেবা চালু হওয়ার পরও কেন সাধারণ মানুষের মন থেকে ভূমি অফিসের ভীতি দূর হচ্ছে না? তথ্যাদি ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মূল কারণ সামনে আসে:
১. টেকনিক্যাল জটিলতা ও পরোক্ষ নির্ভরতা: প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ এখনও প্রযুক্তি-বান্ধব নন। ফলে অনলাইন আবেদন করার জন্য তাদের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা বাইরের কম্পিউটার দোকানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই সুযোগে এক শ্রেণীর অসাধু চক্র বা “ডিজিটাল দালাল” গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ২. নথিপত্র যাচাইয়ের নামে টেবিল টক: আবেদন অনলাইনে হলেও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য নথিপত্র মাঠ পর্যায়ের ভূমি অফিসেই যাচাই করা হয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই এসে থমকে যায় ডিজিটাল গতি। “কাগজে ভুল আছে” বা “শুনানির ডেট পরে হবে”—এমন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখার পুরোনো সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। ৩. আস্থার সংকট: মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা খুব দ্রুত পরিবর্তন হয় না। একজন সাধারণ মানুষ যখন শোনেন যে তার পরিচিত কেউ জমি খারিজ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন, তখন নিজের বেলায় ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর ভরসা রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা
একজন নাগরিক যখন নিজের বৈধ জমির কাগজপত্র নিয়ে কোনো সরকারি অফিসে যেতে স্বস্তি পাওয়ার বদলে ভয় পান, তখন বুঝতে হবে সংকটটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট অফিসের নয়; এটি পুরো সেবা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে আগের চেয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়েছে এবং অনেক নাগরিক এখন কোনো বাড়তি টাকা ছাড়াই সঠিক সময়ে সেবা পাচ্ছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে শতভাগ স্বচ্ছতা না আসা পর্যন্ত মানুষের এই পকেট চেক করার অভ্যাস এবং মনের ভেতরের শঙ্কা দূর করা সম্ভব নয়।
আপনার অভিজ্ঞতা কী? আপনি কি সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল ভূমি সেবার সুবিধা নিয়ে কোনো ঝামেলা ছাড়াই কাজ শেষ করতে পেরেছেন, নাকি আপনাকেও পুরোনো সেই অদৃশ্য নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে পকেট হালকা করতে হয়েছে? আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করুন।

