ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: ওষুধের পাশাপাশি ‘স্মার্ট হ্যাবিট’ গড়তে চিকিৎসকদের পরামর্শ
ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি রোগ। বাংলাদেশেও প্রতি বছর ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে জীবনযাত্রায় কিছু আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন আনলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসা পরামর্শে এমন কয়েকটি ‘স্মার্ট হ্যাবিট’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
খাবারের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটার পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার গ্রহণের পর অল্প সময় হাঁটাহাঁটি করলে শরীর গ্লুকোজ দ্রুত ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত খাবারের পর হাঁটার ফলে শুধু ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণই নয়, হজমশক্তি উন্নত হয় এবং অতিরিক্ত ওজন কমাতেও সহায়তা করে। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই অভ্যাসটি বেশ কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে।
জনপ্রিয় হচ্ছে ‘প্লেট মেথড’
ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে ‘প্লেট মেথড’ একটি বহুল আলোচিত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে খাবারের প্লেটকে তিন ভাগে ভাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে ৫০ শতাংশ অংশে থাকবে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ২৫ শতাংশে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ, ডিম বা মুরগির মাংস এবং বাকি ২৫ শতাংশে থাকবে স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট, যেমন লাল আটার রুটি বা কালো চাল।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, এভাবে খাবার গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার ওঠানামা কম হয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূত হয়।
খালি পেটে মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ
সকালে খালি পেটে মিষ্টি চা, বিস্কুট, সফট ড্রিংক বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞরা দিনের শুরুতে ডিম, ওটস, বাদাম কিংবা লেবু পানি গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। এসব খাবার শরীরে ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে এবং সুগারের মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
পর্যাপ্ত ঘুমকে বলা হচ্ছে ‘গোপন অস্ত্র’
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কম ঘুম ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকরা প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত ঘুম ইনসুলিনকে কার্যকর রাখতে সাহায্য করে, ক্ষুধার অনুভূতি কমায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
মানসিক চাপও বাড়াতে পারে ব্লাড সুগার
অনেকেই খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের দিকে নজর দিলেও মানসিক চাপের বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। অথচ অতিরিক্ত স্ট্রেস শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।
চিকিৎসকরা মেডিটেশন, নামাজ বা প্রার্থনা, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন এবং প্রকৃতির মাঝে হাঁটার মতো কার্যক্রমকে স্ট্রেস কমানোর কার্যকর উপায় হিসেবে উল্লেখ করছেন।
‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ নিয়ে বাড়ছে আগ্রহ
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা নিয়ন্ত্রিত উপবাস পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ওজন কমাতে, ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। বিশেষ করে যারা ইনসুলিন বা ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণ করেন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস শুরু করা উচিত নয়।
পর্যাপ্ত পানি পানও গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে রক্তে গ্লুকোজের ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা বর্তমানে পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে রোগটি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ না করা এবং বছরে অন্তত একবার চোখ, কিডনি ও হৃদ্রোগের পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রার এই ‘স্মার্ট হ্যাবিট’গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

