ইন্টারনেট দুনিয়া

জেমিনির নতুন ‘পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স’ ফিচার: এবার Gmail ও Google Photos-এর তথ্য কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত সহায়তা দেবে AI

গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী জেমিনিতে (Gemini) যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনাময় ফিচার ‘পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স’ (Personal Intelligence)। এই ফিচারের লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীর অনুমতি নিয়ে তাঁর বিভিন্ন গুগল সেবায় থাকা প্রাসঙ্গিক তথ্য কাজে লাগিয়ে আরও ব্যক্তিগত, প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর উত্তর দেওয়া। ফলে পুরোনো ই-মেইল খোঁজা, নির্দিষ্ট ছবি শনাক্ত করা কিংবা আগের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজ আরও সহজ হতে পারে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে কোনো তথ্য খুঁজতে ব্যবহারকারীকে আলাদাভাবে Gmail, Google Photos কিংবা অন্যান্য অ্যাপে যেতে হতো। নতুন এই ব্যবস্থার মূল ধারণা হলো, অনুমোদিত তথ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিষয় খুঁজে বের করে সেগুলোকে একত্রে কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীকে সহায়তা করা। তবে সুবিধার পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং কোন তথ্য AI-এর সঙ্গে ভাগ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কী এই পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স ফিচার?

গুগলের ভাষ্য অনুযায়ী, Personal Intelligence এমন একটি ব্যবস্থা, যা ব্যবহারকারীর অনুমোদিত গুগল অ্যাপের তথ্য, আগের কথোপকথন এবং পছন্দ-অপছন্দের প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জেমিনির উত্তরকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলে। শুধু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়, বরং বিভিন্ন উৎসের তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে ব্যবহারকারীর নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যবহারকারী কয়েক মাস আগে একটি ভ্রমণের বুকিং করেছিলেন। এখন সেই ভ্রমণের তারিখ, হোটেলের নাম কিংবা বুকিংয়ের বিবরণ জানতে চাইলে তাঁকে একের পর এক ই-মেইল ঘাঁটতে নাও হতে পারে। অনুমোদিত তথ্যের সঙ্গে সংযোগ থাকলে জেমিনিকে প্রশ্ন করেই সংশ্লিষ্ট তথ্য খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

যেসব কাজে সুবিধা দিতে পারে নতুন ফিচার

১. পুরোনো ই-মেইল থেকে তথ্য খোঁজা

Gmail-এ থাকা ভ্রমণের বুকিং, কেনাকাটার রসিদ, কোনো প্রতিষ্ঠানের পাঠানো নির্দেশনা কিংবা পুরোনো যোগাযোগের তথ্য খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে। ব্যবহারকারী স্বাভাবিক ভাষায় প্রশ্ন করলে জেমিনি সংযুক্ত তথ্য থেকে প্রাসঙ্গিক বিবরণ বের করে দিতে পারে।

২. Google Photos থেকে নির্দিষ্ট ছবি খোঁজা

দীর্ঘদিনের জমা ছবি ও ভিডিওর মধ্যে নির্দিষ্ট স্মৃতি খুঁজে পাওয়া সহজ হতে পারে। যেমন, আগের কোনো ভ্রমণের ছবি, পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত কিংবা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের ছবি খুঁজতে জেমিনিকে নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। ফিচারের প্রাপ্যতা ও ছবিসংক্রান্ত সুবিধা অ্যাকাউন্ট এবং অঞ্চলের ওপর নির্ভর করতে পারে।

৩. আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ভ্রমণ পরিকল্পনা

আগের বুকিং, পছন্দের জায়গা কিংবা ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য থেকে প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে নতুন ভ্রমণের পরিকল্পনা সাজাতে সাহায্য করতে পারে। এতে ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী সম্ভাব্য গন্তব্য, ভ্রমণসূচি ও করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ পাওয়া সহজ হবে।

৪. ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পরামর্শ

ব্যবহারকারীর আগ্রহ, আগের পছন্দ ও অনুমোদিত তথ্য বিবেচনা করে বই, ভ্রমণ কিংবা বিভিন্ন দৈনন্দিন বিষয়ে তুলনামূলকভাবে প্রাসঙ্গিক পরামর্শ দিতে পারে। ফলে প্রতিবার নিজের পছন্দ ও প্রয়োজন নতুন করে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন কমতে পারে।

এই সুবিধাগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে কোন অ্যাপ সংযুক্ত রয়েছে, সেখানে কী ধরনের তথ্য আছে এবং ব্যবহারকারীর প্রশ্ন কতটা নির্দিষ্ট—তার ওপর। জেমিনির দেওয়া উত্তর সব সময় নির্ভুল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?

পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্সের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, বিভিন্ন অ্যাপের তথ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা।

ধরা যাক, একজন ব্যবহারকারী আগামী মাসে কক্সবাজার ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। তাঁর Gmail-এ আগের হোটেল বুকিংয়ের তথ্য রয়েছে এবং Google Photos-এ আগের ভ্রমণের ছবি সংরক্ষিত আছে। সংযুক্ত অ্যাপগুলোতে প্রবেশের অনুমতি থাকলে জেমিনি এসব তথ্যের প্রাসঙ্গিক অংশ কাজে লাগিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জেমিনি কেবল একটি অ্যাপের তথ্য খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনুমোদিত একাধিক উৎস থেকে তথ্য নিয়ে সেগুলো বিশ্লেষণ করে উত্তর তৈরির চেষ্টা করতে পারে। তবে উদাহরণটি সম্ভাব্য ব্যবহার বোঝানোর জন্য; প্রতিটি ক্ষেত্রে সব তথ্য পাওয়া যাবে বা সঠিকভাবে মিলিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কী বলছে গুগল?

নতুন ফিচারটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি ও নিয়ন্ত্রণ। গুগলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, Personal Intelligence ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট অ্যাপগুলো সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক নয়। ব্যবহারকারী নিজেই ঠিক করতে পারেন কোন অ্যাপের তথ্য জেমিনি ব্যবহার করতে পারবে। সেটিংস থেকে এই সংযোগ পরিবর্তন বা বন্ধ করার সুযোগও রয়েছে।

গুগল আরও জানিয়েছে, Personal Intelligence-এর সঙ্গে সংযুক্ত Gmail বা Google Photos-এর ব্যক্তিগত তথ্য সরাসরি ব্যবহার করে তাদের জেনারেটিভ AI মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। তবে জেমিনির বিভিন্ন ফিচার, ব্যবহারকারীর সেটিংস এবং তথ্য ভাগ করে নেওয়ার পদ্ধতি অনুযায়ী তথ্য প্রক্রিয়াকরণের নিয়ম ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু একটি সাধারণ গোপনীয়তার আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট ফিচারের নীতিমালা পড়ে নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে ই-মেইলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেনের রসিদ, পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের বার্তা, পরিচয়সংক্রান্ত নথি কিংবা অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য থাকতে পারে। একইভাবে Google Photos-এ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি সংরক্ষিত থাকতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগে সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি গোপনীয়তার ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ব্যবহারকারীদের যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত

পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করতে চাইলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।

  • প্রয়োজনীয় অ্যাপই সংযুক্ত করুন: যে অ্যাপের তথ্য ব্যবহার করলে বাস্তব সুবিধা পাওয়া যাবে, কেবল সেটিই সংযুক্ত করার কথা বিবেচনা করুন।

  • সংযুক্ত অ্যাপের তালিকা যাচাই করুন: কোন কোন অ্যাপ জেমিনির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তা সেটিংসে পরীক্ষা করুন।

  • সংবেদনশীল তথ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকুন: ব্যক্তিগত, আর্থিক কিংবা গোপনীয় তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিবেচনা করুন।

  • উত্তরের সত্যতা যাচাই করুন: পুরোনো ই-মেইল, বুকিং, তারিখ কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে মূল উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

  • প্রয়োজনে সংযোগ বন্ধ করুন: ফিচারটি আর ব্যবহার করতে না চাইলে সংযুক্ত অ্যাপের অনুমতি পরিবর্তন বা প্রত্যাহার করুন।

গুগলের তথ্য অনুযায়ী, জেমিনি সংযুক্ত উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের উল্লেখ বা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যাতে ব্যবহারকারী উত্তরটি যাচাই করতে পারেন। কিন্তু AI কখনো ভুল তথ্য দিতে পারে বা ভিন্ন তথ্যের মধ্যে ভুল সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ফিচারটি কি ব্যবহার করা যাবে?

Personal Intelligence-এর প্রাপ্যতা নিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত গুগলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফিচারটি যোগ্য ব্যক্তিগত Google Account ব্যবহারকারীদের জন্য ধাপে ধাপে চালু করা হচ্ছে। এটি ওয়েব, অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসে ব্যবহারের জন্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সব অ্যাকাউন্টে একসঙ্গে সুবিধাটি পাওয়া যাবে, এমন নয়। বয়স, অ্যাকাউন্টের ধরন, অঞ্চল এবং অন্যান্য যোগ্যতার শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

বাংলাদেশের সব ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টে ফিচারটি ইতিমধ্যে চালু হয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই বাংলাদেশ থেকে ব্যবহার করতে চাইলে জেমিনি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে নিজের অ্যাকাউন্টে ফিচারটি দেখা যাচ্ছে কি না, সেটি যাচাই করতে হবে। শুধু জেমিনি ব্যবহার করতে পারলেই Personal Intelligence ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যাবে, এমন নয়।

কীভাবে সংযুক্ত অ্যাপের সেটিংস যাচাই করবেন?

ব্যবহারকারী জেমিনি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে নিজের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে সেটিংসের Connected Apps বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগতকরণ অপশন পরীক্ষা করতে পারেন। সেখানে Personal Intelligence-এর সুবিধা পাওয়া গেলে কোন কোন গুগল অ্যাপ সংযুক্ত করা যাবে, তা দেখার সুযোগ থাকতে পারে। ফিচারটি অ্যাকাউন্টে না এলে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

সেটিংসের নাম ও অবস্থান অ্যাপের সংস্করণ এবং অ্যাকাউন্টের ধরন অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। ফিচারটি চালুর আগে সংশ্লিষ্ট গোপনীয়তা নীতিমালা পড়ে নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমতি নির্ধারণ করাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।

AI ব্যবহারের ভবিষ্যৎ কি আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে?

পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্সের মতো ফিচারগুলো দেখাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার গণ্ডি পেরিয়ে ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজের সহকারী হয়ে উঠছে। ব্যবহারকারীর প্রয়োজন, আগের অভিজ্ঞতা ও পছন্দ সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য কাজে লাগাতে পারলে একই প্রশ্নের উত্তরও আরও কার্যকর হতে পারে।

তবে ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার যত বাড়বে, তথ্যের ওপর ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তার গুরুত্বও তত বাড়বে। সুবিধা পাওয়ার জন্য সব ব্যক্তিগত তথ্যের অনুমতি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কোন তথ্য প্রয়োজন, কোনটি সংযুক্ত করা যুক্তিসংগত এবং কোনটি ব্যক্তিগতই রাখা উচিত—সেই সিদ্ধান্ত ব্যবহারকারীর সচেতনভাবে নেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, Gemini-এর Personal Intelligence দৈনন্দিন ডিজিটাল কাজ সহজ করার সম্ভাবনাময় একটি ফিচার। পুরোনো ই-মেইল খোঁজা থেকে শুরু করে ছবি শনাক্ত করা এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরিতে এটি সময় বাঁচাতে পারে। তবে ফিচারটি ব্যবহার করার আগে প্রাপ্যতা যাচাই, সংযুক্ত অ্যাপের অনুমতি নিয়ন্ত্রণ এবং AI-এর দেওয়া তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

তথ্যসূত্র

admin

আলামিন মিয়া, একজন ব্লগার, ডিজিটাল মার্কেটার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার। ব্লগিংকরছি প্রায় ৭ বছর যাবৎ। বিভিন্ন অনলাইন সেবা হাতের কাছে পেতে নির্দেশনা ও পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করা হয় যা আপনি খুব সহজেই এই ওয়েবসাইট হতে পেতে পারেন। যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য প্রয়োজন হয় বা পরামর্শ থাকে তবে মেইল করুন admin@tricksboss.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *