সুস্থ থাকার চেষ্টা জরুরি, তবে কোনো স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই রোগমুক্তির গ্যারান্টি নয়
স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং সুষম খাবার খাওয়ার বিকল্প নেই। তবে এসব অভ্যাস মেনে চললেই যে জীবনে কোনো রোগ হবে না—এমন নিশ্চয়তা চিকিৎসাবিজ্ঞান দেয় না। বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মূলত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমায়, কিন্তু ঝুঁকি একেবারে শূন্য করে না।
সম্প্রতি চিকিৎসক ডা. সাকলায়েন রাসেল-এর একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক বক্তব্যে এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল ভাবনা হলো—সুস্থ থাকার জন্য আমাদের দায়িত্ব হলো যথাসম্ভব ভালো জীবনযাপন করা; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অসুস্থতা, সুস্থতা ও জীবনের অনেক কিছুই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
হার্ট ভালো রাখতে জীবনযাপন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে জীবনযাপনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, তামাক ব্যবহার ও ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত ঝুঁকি। এসবের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ রক্তশর্করা, অস্বাভাবিক রক্তের চর্বি এবং অতিরিক্ত ওজনের সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থাৎ, ওজন স্বাভাবিক রাখা, ধূমপান না করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর। কিন্তু এগুলো অনুসরণ করলেই হৃদ্রোগ কখনো হবে না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
কারণ বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক ইতিহাস, কিছু রোগ, পরিবেশগত কারণসহ অনেক বিষয়ও মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভূমিকা রাখে।
কিডনি ভালো রাখতে শুধু বেশি পানি খেলেই হবে?
কিডনির স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো—বেশি পানি খেলেই কিডনি রোগ থেকে নিরাপদ থাকা যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (NIDDK) বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। হৃদ্রোগ এবং কিডনি বিকলের পারিবারিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
তাই কিডনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা, স্বাস্থ্যকর ওজন এবং ধূমপান পরিহার।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যথানাশক ওষুধ। কিছু NSAID ধরনের ব্যথানাশক—যেমন ibuprofen ও naproxen—বিশেষ করে কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক গ্রহণ করা ঠিক নয়।
নিয়মিত খাবার খেলেই কি গ্যাস্ট্রিক বা আলসার হবে না?
এখানেও একটু সংশোধন প্রয়োজন। সময়মতো খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলা সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে। কিন্তু এগুলো মানলেই পেপটিক আলসার হবে না, এমন বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই।
NIDDK-এর তথ্য অনুযায়ী, পেপটিক আলসারের সবচেয়ে সাধারণ দুটি কারণ হলো Helicobacter pylori (H. pylori) সংক্রমণ এবং NSAID ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ। ধূমপানও আলসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এমনকি NIDDK বলছে, নির্দিষ্ট কোনো খাবার বা বিশেষ ডায়েট আলসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করে—এমন যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
তাই নিয়মিত খাবার খাওয়া ভালো অভ্যাস হলেও পেটে দীর্ঘদিন ব্যথা, অস্বস্তি, বমি, কালো পায়খানা বা রক্তবমির মতো উপসর্গ দেখা দিলে শুধু খাবারের অভ্যাসের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলেও অন্য রোগ হতে পারে
একজন মানুষ নিয়মিত ব্যায়াম করেন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখেন, ধূমপান করেন না, সুষম খাবার খান এবং রক্তচাপ-ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখেন—এগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাঁর কিডনি, লিভার, চোখ, কান, মস্তিষ্ক বা অন্য কোনো অঙ্গের সমস্যা হবে না। একইভাবে ক্যান্সার, সংক্রমণ, স্ট্রোক বা অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও কখনো শূন্য হয়ে যায় না।
বিশেষ করে অনেক দীর্ঘমেয়াদি রোগের শুরুতে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, NIDDK বলছে প্রাথমিক কিডনি রোগে অনেক সময় কোনো উপসর্গ থাকে না এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করাই রোগ শনাক্ত করার উপায় হতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু ‘আমি সুস্থ বোধ করছি’—এটিকে সবসময় শরীরের ভেতরের পূর্ণ সুস্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
তাহলে সুস্থ থাকার উপায় কী?
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমানো এবং শরীরকে যতটা সম্ভব ভালো রাখা—কোনো রোগ না হওয়ার গ্যারান্টি পাওয়া নয়।
বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী—
- সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া
- অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
- ধূমপান ও তামাক বর্জন করা
- রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা
- প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ না খাওয়া
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা
NIDDK কিডনি সুরক্ষার ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর ওজন, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান বন্ধ এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
‘ক্র্যাশ ডায়েট’ নয়, দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ
ওজন কমানোর জন্য অনেকে দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় কিটো, অত্যন্ত কম-কার্ব বা নানা ধরনের কঠোর ডায়েট অনুসরণ করেন। কিন্তু কোনো একটি ডায়েট সবার জন্য উপযুক্ত—এমন ধারণা ঠিক নয়।
বরং যে খাদ্যাভ্যাস একজন মানুষ দীর্ঘদিন বাস্তবসম্মতভাবে মেনে চলতে পারবেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের ধরন ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগ, ওষুধ, কাজের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
সুতরাং ‘যেভাবেই হোক ওজন কমাতে হবে’—এর পরিবর্তে লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর ওজন এবং দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন।
সুস্থতার দায়িত্ব আমাদের, ফলাফলের নিশ্চয়তা নয়
ডা. সাকলায়েন রাসেলের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্ভবত এখানেই—স্বাস্থ্য নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই, আবার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়ারও কারণ নেই।
নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, ব্যায়াম করা, ওজন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান না করা—এসবের মাধ্যমে আমরা সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারি। কিন্তু জীবনে কখন কোন অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা আসবে, তা পুরোপুরি মানুষের হাতে নেই।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে একদিকে স্বাস্থ্যসচেতন করে, অন্যদিকে ‘একটি ভুল খাবার খেলেই সব শেষ’ কিংবা ‘একটি নির্দিষ্ট ডায়েট অনুসরণ করলেই কোনো রোগ হবে না’—এ ধরনের চরম ধারণা থেকে দূরে রাখে।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমন্বয়
স্বাস্থ্যসচেতনতার পাশাপাশি একজন বিশ্বাসী মানুষের কাছে সুস্থতা আল্লাহর নিয়ামত—এ বিশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শু‘আরা’র ৮০ নম্বর আয়াতে এসেছে:
“আর যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন।”
আয়াতটির ইংরেজি অনুবাদেও একই অর্থ পাওয়া যায়—“And when I am ill, it is He who cures me.”
অর্থাৎ, সুস্থতার জন্য চেষ্টা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা—দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসা গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা মানুষের দায়িত্ব; আর সুস্থতার চূড়ান্ত ফল আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল—এমন বিশ্বাস একজন মানুষকে মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথা
সুস্থ থাকার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দর্শন হতে পারে—নিজের শরীরের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, কিন্তু সুস্থতার ব্যাপারে অহংকারী বা অতিরিক্ত আতঙ্কিত না হওয়া।
এমন অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার, যা এক সপ্তাহ বা এক মাস নয়—সারাজীবন মেনে চলা সম্ভব। এমন খাবার বেছে নেওয়া দরকার, যা স্বাস্থ্যকর হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবসম্মত। আর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
কারণ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন রোগের ঝুঁকি কমায়, কিন্তু মানুষকে রোগ ও দুর্ঘটনার সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না। তাই সুস্থ থাকার জন্য চেষ্টা থাকবে—কিন্তু সুস্থতা নিয়ে অযথা ‘ক্রেজি’ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

