ডায়াবেটিসে পায়ে জ্বালাপোড়া ও ঝিনঝিনি: কেন হয় এবং কীভাবে মুক্তি পাবেন?
ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা, যা শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গেই প্রভাব ফেলতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকের মধ্যেই একটি সাধারণ ও কষ্টদায়ক উপসর্গ দেখা যায়—পায়ে তীব্র জ্বালাপোড়া, ঝিনঝিনি করা বা সুই ফোটার মতো অনুভূতি। অনেকেই এটিকে সাধারণ ক্লান্তি ভেবে ভুল করেন, যা পরবর্তীতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক কেন এই সমস্যা হয় এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী।
কেন ডায়াবেটিসে পায়ে জ্বালা বা ঝিনঝিনি হয়?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি (Diabetic Neuropathy)। এটি মূলত স্নায়ু বা নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঘটে। এর পেছনের মূল কারণগুলো হলো:
স্নায়ুর ক্ষতি: রক্তে দীর্ঘদিন ধরে শর্করার বা সুগারের মাত্রা বেশি থাকলে তা শরীরের সূক্ষ্ম স্নায়ুগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রক্ত চলাচলে বাধা: অতিরিক্ত সুগার স্নায়ুর চারপাশের রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে স্নায়ুগুলোতে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ কমে যায় এবং স্নায়ুগুলো স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
পায়ের স্নায়ু কেন বেশি আক্রান্ত হয়: আমাদের শরীরের স্নায়ুগুলোর মধ্যে পায়ের স্নায়ুগুলো সবচেয়ে লম্বা। লম্বা হওয়ার কারণে এগুলো বেশি সংবেদনশীল এবং রক্ত সরবরাহের সামান্য তারতম্যেই সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একারণেই উপসর্গগুলো সাধারণত পা থেকেই শুরু হয়।
রাতের তীব্রতা: সারাদিনের ব্যস্ততায় অনেকে এটি খেয়াল করেন না, তবে রাতে ঘুমানোর সময় বা বিশ্রামের সময় এই জ্বালাপোড়া ও ঝিনঝিনির অনুভূতি অনেক বেশি তীব্র আকার ধারণ করে।
সতর্কবার্তা: যদি এই সমস্যার সময়মতো চিকিৎসা বা নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে ধীরে ধীরে পায়ের অনুভূতি সম্পূর্ণ লোপ পেতে পারে। অনুভূতি কমে গেলে পায়ে কোনো কাটাছেঁড়া, ক্ষত বা আঘাত লাগলেও রোগী তা টের পান না, যা পরবর্তীতে মারাত্মক ইনফেকশন বা গ্যাংগ্রিনের রূপ নিতে পারে।
এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়: কী করবেন?
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব না হলেও সঠিক নিয়মের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জটিলতা এড়ানো সম্পূর্ণ সম্ভব।
১. রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা: এটিই সবচেয়ে প্রধান এবং কার্যকরী পদক্ষেপ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করে এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের মাধ্যমে রক্তের শর্করা সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
২. নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিয়ম করে হাঁটুন বা হালকা ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম করুন। এটি পায়ে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে এবং স্নায়ুর কার্যক্ষমতা সচল রাখতে সাহায্য করে।
৩. পায়ের বিশেষ যত্ন নেওয়া: প্রতিদিন নিয়ম করে পা কুসুম গরম পানি ও মৃদু সাবান দিয়ে ধুয়ে নরম তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে শুকিয়ে নিন (বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকগুলো)। পায়ে কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া, ফোস্কা বা লালচে ভাব আছে কিনা তা প্রতিদিন পরীক্ষা করুন। সবসময় নরম ও আরামদায়ক জুতো এবং সুতির মোজা পরিধান করুন।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া: পায়ের অস্বস্তি যদি দিন দিন বাড়তে থাকে, তবে ঘরে বসে না থেকে অবিলম্ব একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (Endocrinologist বা Neurologist) পরামর্শ নিন। স্নায়ুর ব্যথা ও জ্বালাপোড়া কমানোর জন্য বেশ কিছু কার্যকরী ওষুধ রয়েছে, যা চিকিৎসক আপনার শারীরিক অবস্থা বুঝে নির্ধারণ করবেন।
উপসংহার: ডায়াবেটিসে পায়ের যত্ন নেওয়া মোটেও অবহেলার বিষয় নয়। সচেতনতা এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের মাধ্যমেই কেবল ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির মতো জটিলতা থেকে পা-কে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

