নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে সাধারণ মানুষ : সরকারি স্কিমেই মিলছে ভরসা
বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে “নিরাপত্তা”। শেয়ার বাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের চেয়ে বাংলাদেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন সরকারি সঞ্চয়পত্র, বন্ড এবং পেনশনের মতো নিশ্চিত আয়ের মাধ্যমগুলোকে বেশি বেছে নিচ্ছেন। সরকারের সরাসরি গ্যারান্টি এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর নিশ্চিত মুনাফা থাকায় এসব স্কিম বর্তমানে বিনিয়োগের সেরা অপশন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সঞ্চয়পত্র: মধ্যবিত্তের প্রথম পছন্দ
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের প্রধান উৎস হিসেবে রাজত্ব করছে সঞ্চয়পত্র। বর্তমানে ৪টি প্রধান সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকারীদের কাছে জনপ্রিয়:
পরিবার সঞ্চয়পত্র: বিশেষ করে নারী ও বয়স্কদের জন্য উচ্চ মুনাফার এই স্কিমটি অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন।
পেনশনার সঞ্চয়পত্র: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এটি একটি বড় আস্থার জায়গা।
বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র: নিয়মিত আয়ের উৎস হিসেবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
সর্বজনীন পেনশন স্কিম: ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত
২০২৪ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিম ২০২৬ সালে এসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বর্তমানে চারটি ভিন্ন স্কিমে সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করছে: ১. প্রগতি: বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য। ২. সুরক্ষা: স্বনির্ভর বা অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের জন্য। ৩. সমতা: স্বল্প আয়ের নাগরিকদের জন্য (যেখানে সরকার ৫০% চাঁদা প্রদান করে)। ৪. প্রবাস: প্রবাসীদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগের সুযোগ।
বন্ড ও ট্রেজারি বিল: স্মার্ট বিনিয়োগের মাধ্যম
প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্রেজারি বিল ও বন্ড এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজলভ্য।
ট্রেজারি বিল: ডিসকাউন্টে কেনা যায় এবং ম্যাচিউরিটিতে পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায়।
ট্রেজারি বন্ড: নির্দিষ্ট সময় পর পর ইন্টারেস্ট এবং সরকারের ১০০% গ্যারান্টি থাকায় এটি ব্যাংক আমানতের বিকল্প হিসেবে দাঁড়াচ্ছে।
প্রবাসী বন্ড: ওয়েজ আর্নার বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড এবং ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি লাভজনক মুনাফা পাচ্ছেন।
সুদবিহীন বিনিয়োগ: সরকারি সুকুক
ধর্মপ্রাণ ও সুদবিহীন বিনিয়োগে আগ্রহীদের জন্য ‘সরকারি সুকুক’ বা ইসলামিক বন্ড একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। শরিয়াহভিত্তিক এই বিনিয়োগে সুদের বদলে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়, যা দেশে ইসলামিক ফাইন্যান্সিংয়ের প্রসারে বড় ভূমিকা রাখছে।
পোস্ট অফিস ও প্রাইজবন্ড
গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে এখনো ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক (সাধারণ ও মেয়াদি হিসাব) অত্যন্ত জনপ্রিয়। অন্যদিকে, মাত্র ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে ১০০% নিরাপত্তা এবং ড্রয়ের মাধ্যমে কোটি টাকা জেতার সুযোগ থাকায় প্রাইজবন্ড এখনো সাধারণ মানুষের শখ ও বিনিয়োগের সংমিশ্রণ হিসেবে টিকে আছে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি বিনিয়োগ দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সহায়তা করে এবং সাধারণ মানুষের অলস টাকাকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করে। তবে বিনিয়োগের সীমা এবং ট্যাক্স সংক্রান্ত নিয়মগুলো ভালোভাবে বুঝে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিনিয়োগ পরামর্শ: যেকোনো স্কিমে বিনিয়োগের আগে বর্তমান মুনাফার হার এবং উৎসে কর (Source Tax) সম্পর্কে নিকটস্থ ব্যাংক বা জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর থেকে জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

