পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির মাধ্যমে চেকে মামলা করা যাবে: আপিল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রায়
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা মূলে মূল পাওনাদারের পরিবর্তে তাঁর মনোনীত ব্যক্তি বা আইনগত প্রতিনিধি চেকে এনআই অ্যাক্টের (Negotiable Instruments Act, 1881) অধীনে মামলা দায়ের করতে পারবেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন যে, এ ধরণের মামলা দায়ের এবং আদালতের জবানবন্দি গ্রহণ সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং এতে কোনো আইনি বাধা নেই।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক ৫৬ ডিএলআর (এডি) ১৭ (56 DLR (AD) 17) মামলায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়।
মামলার পটভূমি ও বিবরণ: নথিসূত্রে জানা যায়, আসামী হাসিবুল বাশার তাঁর আত্মীয় আনোয়ারুল ইসলামের কাছ থেকে ৩০,৭৭,০০০ (ত্রিশ লক্ষ ৭৭ হাজার) টাকা ধার নিয়েছিলেন। এই টাকা পরিশোধের অংশ হিসেবে তিনি ৩টি চেক প্রদান করেন। তবে চেকগুলো ব্যাংকে উপস্থাপনের পর পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় এবং পেমেন্ট বন্ধ করে দেওয়ায় বারবার ডিজঅনার (Dishonour) হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ বা আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও টাকা পরিশোধ না করায়, মূল পাওনাদার আনোয়ারুল ইসলামের নিয়োজিত পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি প্রাপ্ত ব্যক্তি গুলজার রহমান ঢাকার সিএমএম (CMM) আদালতে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন।
আসামী পক্ষের আইনি যুক্তি: মামলা দায়েরের পর আসামী পক্ষ তা বাতিল চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্টে কোয়াশমেন্টের (Quashment) আবেদন করেন। তাদের প্রধান দুটি আইনি যুক্তি ছিল: ১. এনআই অ্যাক্টের ১৪১ ধারা অনুযায়ী, চেকে মামলা সরাসরি ‘পেয়ী’ (Payee) বা যাঁর নামে চেক ইস্যু করা হয়েছে, তাঁকেই করতে হবে। ২. যেহেতু মূল পাওনাদার আনোয়ারুল ইসলামের বদলে তাঁর অ্যাটর্নি মামলা করেছেন এবং জবানবন্দি দিয়েছেন, তাই এই পুরো আইনি প্রক্রিয়াটি অবৈধ।
হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়: হাইকোর্ট বিভাগ আসামী পক্ষের আবেদন ও রুলটি খারিজ করে দেন এবং অভিমত দেন যে, পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দ্বারা চেকে মামলা চলতে আইনি কোনো বাধা নেই।
পরবর্তীতে আসামী পক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল পিটিশন দায়ের করলে আপিল বিভাগও তা খারিজ করে দেন এবং হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল রাখেন।
আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও নজির: আপিল বিভাগ মামলার চূড়ান্ত ফলাফলে স্পষ্ট করে বলেন:
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি আইন অনুযায়ী, একজন আমমোক্তার (Attorney) তাঁর দাতার (Principal) পক্ষে মামলা দায়ের করা বা যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন।
দেশের পূর্বের নজির (যেমন- ১৯৯৬ BLD (AD) ২০৬) টেনে আদালত উল্লেখ করেন, পেয়ীর পক্ষে তাঁর অ্যাটর্নি মামলা দায়ের করলে এবং আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারায় ওই অ্যাটর্নির জবানবন্দি গ্রহণ করে মামলা আমলে (Cognizance) নিলে তা সম্পূর্ণ বৈধ বলে গণ্য হবে।
আইনি প্রভাব ও গুরুত্ব: এই রায়ের মাধ্যমে এটি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো যে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজে উপস্থিত হয়ে চেকে মামলা করতে অপরাগ হন, তবে তিনি আইনসম্মতভাবে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি নিয়োগ করে তাঁর মাধ্যমে এনআই অ্যাক্টের অধীনে মামলা পরিচালনা করতে পারবেন। এটি দেশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ পাওনাদারদের আইনি জটিলতা অনেকাংশে লাঘব করবে।

