রোগ প্রতিরোধ ও তারুণ্য ধরে রাখতে ‘অটোফেজি’ : কীভাবে কাজ করে এই অলৌকিক নিরাময় ব্যবস্থা?
আজকাল স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মধ্যে ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে উপবাস করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রোজা রাখার অভ্যাস তো বহু প্রাচীন। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পেছনে কেবল ধর্মীয় বা ওজন কমানোর সুবিধাই নয়, বরং শরীরের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য বৈজ্ঞানিক নিরাময় প্রক্রিয়া—যার নাম ‘অটোফেজি’ (Autophagy)। ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি এই অটোফেজি প্রক্রিয়ার রহস্য উন্মোচন করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
অটোফেজি আসলে কী?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অটোফেজি হলো শরীরের কোষগুলোর নিজস্ব “ক্লিনআপ মেকানিজম” বা আবর্জনা পরিষ্কারের প্রক্রিয়া। গ্রিক শব্দ ‘অটো’ (Auto) অর্থ স্বয়ংক্রিয় এবং ‘ফেজি’ (Phagy) অর্থ গ্রাস করা বা খাওয়া। অর্থাৎ, এই প্রক্রিয়ায় শরীর নিজের কোষ নিজেই খায়। তবে ভয়ের কিছু নেই; শরীর এখানে সুস্থ কোষগুলোকে ধ্বংস করে না। বরং কোষের ভেতরে জমে থাকা পুরনো, অকেজো বা ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন, টক্সিন এবং রোগাক্রান্ত অংশগুলোকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এবং সেগুলোকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী শক্তিতে রূপান্তর করে। এটি একাধারে শরীরের কোষ পুনর্নবীকরণ করে এবং শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ ও রোগমুক্ত রাখে।
কখন এবং কীভাবে শুরু হয় এই প্রক্রিয়া?
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, রোজা বা উপবাস শুরু করার সাধারণত ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়াটি সক্রিয় হতে শুরু করে। তবে এই সময়সীমা প্রতিটি মানুষের শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে অটোফেজি সক্রিয় হয়:
১. ফাস্টিং পিরিয়ডের দৈর্ঘ্য: খাবার খাওয়ার পর শরীর তা থেকে শক্তি উৎপাদন করে। কিন্তু একটানা ১২ ঘণ্টার বেশি উপবাস করলে লিভারে জমা থাকা গ্লাইকোজেন (শর্করা) শেষ হয়ে যায়। তখন শরীর শক্তির বিকল্প উৎস খুঁজতে গিয়ে কোষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় পদার্থগুলো ভাঙা শুরু করে। ২. ইনসুলিনের মাত্রা: রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা যত কম থাকবে, অটোফেজি তত দ্রুত কাজ করবে। যারা নিয়মিত ‘লো-কার্ব’ (স্বল্প শর্করা) বা ‘কেটোজেনিক ডায়েট’ অনুসরণ করেন, তাদের শরীর দ্রুত ফ্যাট বার্ন করতে পারে, যা অটোফেজিকে ত্বরান্বিত করে। ৩. শারীরিক ক্রিয়াকলাপ: ফাস্টিং বা রোজা থাকা অবস্থায় শরীর অলস না রেখে সচল রাখলে এই প্রক্রিয়া আরও গতি পায়।
অটোফেজি দ্রুত সক্রিয় বা ত্বরান্বিত করার উপায়
আপনি যদি আপনার শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়াটিকে আরও কার্যকর ও দ্রুত করতে চান, তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:
১৬:৮ ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং: এটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়। এই নিয়মে দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘণ্টা সম্পূর্ণ উপবাস (শুধুমাত্র পানি বা ক্যালরিহীন পানীয় নেওয়া যাবে) থাকতে হয় এবং বাকি ৮ ঘণ্টার উইন্ডোতে পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়।
দীর্ঘমেয়াদী ফাস্টিং: মাঝেমধ্যে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার দীর্ঘ উপবাস অটোফেজিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। তবে এই ধরনের দীর্ঘ ফাস্টিং অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া করা উচিত নয়।
ফাস্টিং অবস্থায় হালকা ব্যায়াম: রোজা বা ফাস্টিং থাকা অবস্থায় হালকা ব্যায়াম বা নিয়ম করে হাঁটাচলা করলে শরীর দ্রুত গ্লাইকোজেন শূন্য হয়, ফলে অটোফেজি দ্রুত শুরু হয়।
সুগার ও কার্বোহাইড্রেট নিয়ন্ত্রণ: উচ্চ শর্করা ও মিষ্টি জাতীয় খাবার রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা অটোফেজি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে বা পিছিয়ে দেয়। তাই খাবারে শর্করার পরিমাণ কমিয়ে ভালো ফ্যাট ও প্রোটিন যুক্ত করতে হবে।
অটোফেজির অবিশ্বাস্য স্বাস্থ্য উপকারিতা
শরীরের সার্বিক সুস্থতায় অটোফেজির অবদান অপরিসীম। গবেষণায় এর বেশ কিছু চমকপ্রদ উপকারিতা উঠে এসেছে:
টক্সিন দূরীকরণ: কোষের গভীর থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য ও টক্সিন পরিষ্কার করে শরীরকে ডিটক্সিফাই করে।
বার্ধক্য প্রতিরোধ (Anti-aging): পুরনো কোষ ধ্বংস করে নতুন ও সুস্থ কোষ তৈরি করার মাধ্যমে এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায় এবং বয়সের ছাপ কমাতে সাহায্য করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: শরীরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (Inflammation) কমিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মারাত্মক রোগের ঝুঁকি হ্রাস: নিয়মিত অটোফেজি সক্রিয় হলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগ যেমন—আলঝাইমার এবং এমনকি ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
অটোফেজি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী হলেও দীর্ঘ সময় উপবাস করার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, ডায়াবেটিসের রোগী যারা নিয়মিত ইনসুলিন নেন এবং হৃদরোগ বা অন্য কোনো ক্রনিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘ ফাস্টিং শুরু করার আগে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শরীরের সক্ষমতা বুঝে ধীরে ধীরে ফাস্টিংয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাই স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর।

