১১ বছরের স্থবির বেতন কাঠামো ও আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি: দেয়ালে পিঠ ঠেকছে সরকারি চাকরিজীবীদের
২০১৫ থেকে ২০২৬—মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ ১১টি বছর। এই এক দশকে পদ্মা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে, পাল্টে গেছে দেশের অর্থনীতির মানচিত্র। কিন্তু বদলায়নি কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন কাঠামো। বাজারের ব্যাগ হাতে নিলে যে কোনো মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত সরকারি কর্মচারীর কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে সবকিছুর দাম কয়েক গুণ বেড়েছে, সেখানে মেধাবীদের কেন এক দশক আগের হিসেবে জীবনযাপন করতে হবে?
১১ বছর পর বাজার কি স্থির ছিল?
সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য অধিকার। কিন্তু ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি। সমালোচকদের দাবি ছিল, বেতন বাড়লে বাজারের ওপর চাপ পড়বে। কিন্তু ভুক্তভোগী চাকরিজীবীদের প্রশ্ন—গত ১১ বছরে তো নতুন পে-স্কেল হয়নি, তাহলে ৭০ টাকার সয়াবিন তেল ২০০ টাকা আর ৪০ টাকার চাল ৮০ টাকা হলো কীভাবে? বাজার কি তথাকথিত অর্থনৈতিক থিওরি মেনে স্থির ছিল?
স্বর্ণ ও ডলারের নিরিখে বেতনের করুণ দশা
অর্থনীতির সহজ সমীকরণ বলছে, মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়:
স্বর্ণের দাম: ২০১৫ সালে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ছিল প্রায় ৪৩ হাজার টাকা। ২০২৬ সালে সেই একই পরিমাণ স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ স্বর্ণের মানদণ্ডে টাকার মান কমেছে প্রায় ৬ গুণ।
পরিবহন ও নিত্যপণ্য: ২০১৫ সালে যেখানে রিকশা ভাড়া ছিল ২০ টাকা, এখন তা ১০০ টাকার নিচে নামছে না। বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সন্তানের শিক্ষা খরচ—সবই বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ বেতন পড়ে আছে সেই ‘মান্ধাতা আমলের’ কাঠামোতেই।
৫ শতাংশের দায়ে ৯৫ শতাংশের শাস্তি কেন?
সরকারি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে একটি কমন অভিযোগ হলো ‘ঘুষ’। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? একজন সাধারণ কর্মচারী জানান, “রাষ্ট্রের সব সেক্টরে কি উপরি আয়ের সুযোগ আছে? যারা দুর্নীতি করে সেই ৫ শতাংশকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু সেই গুটিকয়েক মানুষের দোহাই দিয়ে কেন ৯৫ শতাংশ সৎ ও মেধাবী মানুষকে পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হবে?” মেধা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেও যদি সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার নূন্যতম সংস্থান না থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।
দাবি ও বাঁচার আকুতি
সরকারি কর্মচারীদের পক্ষ থেকে এখন দুটি প্রধান দাবি উঠে আসছে: ১. হয় বাজার দর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু ২০১৫ সালের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে এবং বিশেষ রেশন কার্ডের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ২. অথবা বর্তমান স্বর্ণ ও ডলারের বিনিময় মূল্যের সাথে সমন্বয় করে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক নতুন পে-স্কেল কার্যকর করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত: অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন যদি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে প্রশাসনে অস্থিরতা এবং অদক্ষতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। মেধাবীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে রেখে কোনো রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। এখন সময় এসেছে অর্থনীতির দোহাই না দিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার।

