উত্তরাধিকার বণ্টনে হানাফী আইনের প্রয়োগ: কার অংশ কত?
মুসলিম আইনে উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং ধর্মীয় বিধাননির্ভর প্রক্রিয়া। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন, ঋণ পরিশোধ এবং বৈধ অছিয়ত পূরণের পর অবশিষ্ট সম্পত্তি বণ্টন করা হয়। বাংলাদেশে সুন্নি মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের কারণে সাধারণত হানাফী আইন অনুযায়ী এই বণ্টন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, ৬ জন উত্তরাধিকারী কখনোই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন না। তারা হলেন— পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা। নিম্নে এই আইন অনুযায়ী বিভিন্ন অংশীদারদের প্রাপ্য অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. প্রাথমিক ৬ উত্তরাধিকারীর অংশ:
পিতা: মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা মোট সম্পত্তির ১/৬ অংশ পাবেন। সন্তান না থাকলে কিন্তু অন্য অংশীদার থাকলে তিনি অবশিষ্ট ভোগী হিসেবে সম্পদ পাবেন।
মাতা: সন্তান থাকলে বা একাধিক ভাই-বোন থাকলে মাতা ১/৬ অংশ পাবেন। সন্তান না থাকলে বা মাত্র একজন ভাই-বোন থাকলে তিনি ১/৩ অংশ পাবেন।
স্বামী ও স্ত্রী: স্ত্রীর মৃত্যুতে সন্তান থাকলে স্বামী পান ১/৪ অংশ, আর সন্তান না থাকলে পান ১/২ অংশ। অন্যদিকে, স্বামীর মৃত্যুতে সন্তান থাকলে স্ত্রী পান ১/৮ অংশ এবং সন্তান না থাকলে পান ১/৪ অংশ।
পুত্র ও কন্যা: পুত্র সবসময়ই উত্তরাধিকারী হন। যদি পুত্র ও কন্যা উভয়ই থাকে, তবে পুত্র কন্যার দ্বিগুণ (২:১ অনুপাতে) সম্পদ পাবেন। যদি কেবল একজন কন্যা থাকে তবে তিনি অর্ধেক (১/২) পাবেন, আর একাধিক কন্যা থাকলে তারা একত্রে ২/৩ অংশ পাবেন।
২. দাদা ও দাদী/নানীর অংশ:
দাদা (পিতামহ): মৃত ব্যক্তির পিতা জীবিত থাকলে দাদা কোনো অংশ পান না। তবে পিতা না থাকলে এবং মৃত ব্যক্তির পুত্র থাকলে দাদা ১/৬ অংশ পান। সন্তান না থাকলে তিনি অবশিষ্ট ভোগী (আসাবা) হিসেবে সম্পদ পান।
নানী ও দাদী: মৃত ব্যক্তির মাতা জীবিত থাকলে এরা কোনো অংশ পান না। মাতা না থাকলে তারা সম্পত্তির ১/৬ অংশ পেয়ে থাকেন।
৩. পুত্রের কন্যা ও বৈপিত্রেয় ভাই:
পুত্রের কন্যা: মৃত ব্যক্তির যদি নিজের কোনো পুত্র না থাকে, তবে পুত্রের কন্যা সম্পত্তির অংশীদার হন। এক্ষেত্রে একজন কন্যা থাকলে তিনি ১/৬ অংশ পান। তবে মৃত ব্যক্তির একাধিক নিজস্ব কন্যা থাকলে পুত্রের কন্যা কোনো অংশ পান না।
বৈপিত্রেয় ভাই: মৃত ব্যক্তির সন্তান বা নাতি-নাতনি কেউ না থাকলে বৈপিত্রেয় ভাই (মায়ের দিক থেকে ভাই) অংশীদার হন। একজন হলে ১/৬ এবং একাধিক হলে ১/৩ অংশ পান।
সম্পত্তি বণ্টনের আবশ্যিক ধাপ:
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের আগে তিনটি ধাপ অবশ্যই সম্পন্ন করতে হয়: ১. মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের খরচ। ২. মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধ। ৩. যদি কোনো বৈধ উইল বা অছিয়ত থাকে (সর্বোচ্চ ১/৩ অংশের জন্য), তা পূরণ করা।
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত বণ্টন পদ্ধতি, যা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অধিকার নিশ্চিত করে। এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে জানা থাকলে পারিবারিক বিবাদ যেমন কমে, তেমনি ধর্মীয় অনুশাসনও নিশ্চিত হয়।

মায়ের সম্পদ কি কন্যা সন্তান বেশি পায়?
সাধারণ একটি ধারণা প্রচলিত থাকলেও, উত্তরটি হলো— না, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (হানাফী) অনুযায়ী মায়ের সম্পদে কন্যা সন্তান বেশি পায় না।
ইসলামী শরিয়াহ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত হানাফী আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তি পুরুষ হোন বা নারী (বাবা বা মা), তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির বণ্টনের নিয়ম একই থাকে। অর্থাৎ, বাবার সম্পত্তির ক্ষেত্রে যেভাবে ভাই-বোনের মধ্যে বণ্টন হয়, মায়ের সম্পত্তির ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে বণ্টন হবে।
নিচে বিষয়টি পরিষ্কার করা হলো:
১. ভাই-বোনের মধ্যে বণ্টন (পুত্র ও কন্যা)
মৃত ব্যক্তির (মায়ের) যদি পুত্র এবং কন্যা উভয়ই থাকে, তবে পুত্র যে পরিমাণ পাবে, কন্যা তার অর্ধেক পাবে। অর্থাৎ এখানে অনুপাত হবে ২:১।
উদাহরণস্বরূপ: মায়ের ত্যাজ্য সম্পত্তি ৩ ভাগ হলে, পুত্র পাবে ২ ভাগ এবং কন্যা পাবে ১ ভাগ।
২. যদি শুধু কন্যা থাকে (পুত্র না থাকলে)
যদি মৃত মায়ের কোনো পুত্র না থাকে, তবে কন্যারা নির্দিষ্ট অংশ পান:
যদি একজন মাত্র কন্যা থাকে, তবে তিনি মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবেন।
যদি একাধিক কন্যা থাকে (যেমন ২ বা ৩ জন), তবে তারা সবাই মিলে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) পাবেন এবং তা নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবেন।
৩. স্বামী ও অন্যান্যদের অংশ
মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তাঁর স্বামী (মৃতার স্বামী) এবং বাবা-মা বেঁচে থাকলে তারাও নির্দিষ্ট অংশ পাবেন। এই অংশগুলো দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা পুত্র ও কন্যাদের মধ্যে বণ্টিত হবে।
কেন এই ভুল ধারণাটি তৈরি হয়?
অনেকে মনে করেন মা যেহেতু নারী, তাই তাঁর সম্পদে মেয়ের অধিকার বেশি। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে মালিকের লিঙ্গভেদে বণ্টনের নিয়ম পরিবর্তন হয় না। সম্পত্তির মালিক বাবা হোন বা মা, পুত্র সবসময় কন্যার দ্বিগুণ সম্পদ পায়। তবে কন্যারা তাঁদের বিয়ের সময় দেনমোহর এবং বিয়ের পর স্বামীর সম্পত্তিতে ভাগ পায় বলে ইসলামে এই বণ্টন ভারসাম্য রক্ষা করে।

