জাতীয় বেতন কাঠামো ২০২৬

নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে শেষ ধাপ, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে প্রজ্ঞাপন

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬–এর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া রেজল্যুশন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরার পর বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা আইনি যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ভেটিং শেষ হলেই প্রজ্ঞাপনে এসআরও নম্বর দিয়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের ক্ষেত্রে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধাপ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে; এখন বাকি রয়েছে প্রজ্ঞাপনের আইনি ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিগগিরই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিজি প্রেসের পর এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ সেপ্টেম্বর নবম পে-স্কেলের রেজল্যুশন বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছিল। প্রয়োজনীয় মুদ্রণ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফিরে আসে। এরপর প্রজ্ঞাপনটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। বর্তমানে সেখানে এর বিভিন্ন আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

ভেটিংয়ের উদ্দেশ্য মূলত প্রজ্ঞাপনের ভাষা, বিধান, প্রয়োগের ক্ষেত্র এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা। এই ধাপ শেষ হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রজ্ঞাপনে এসআরও নম্বর দেওয়া হবে। এরপরই সরকারি গেজেট হিসেবে তা প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেই গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তখন জানানো হয়েছিল, খসড়া বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এসআরও নম্বর দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে।

৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

নবম জাতীয় পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ সম্পন্ন হয় ৩১ আগস্ট ২০২৬। ওই দিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী নতুন পে-স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকার বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫–এর কাজের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসর সুবিধা, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয় এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পর্যালোচনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা

নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নিম্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির হার। প্রস্তাবিত ও অনুমোদিত কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।

এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ গ্রেডের তুলনায় বেশি হচ্ছে। নতুন কাঠামোয় বেতন বৈষম্যও কিছুটা কমানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত যেখানে প্রায় ১:১.৯৪৫, নতুন কাঠামোয় তা প্রায় ১:১.৭৮ করার কথা জানানো হয়েছে।

একবারে পুরো বেতন কার্যকর হচ্ছে না

নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের পুরোটা একসঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত বেতনের অংশ প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে বাকি ২৫ শতাংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত অংশ যথাক্রমে ৪০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ হারে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের দৃষ্টিতে এর অন্যতম কারণ হলো একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের চাপ এড়ানো। বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে নতুন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব বড় হওয়ায় রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কারা উপকৃত হবেন?

নতুন পে-স্কেলের আওতায় শুধু বর্তমান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, পেনশনভোগীরাও এর প্রভাবের মধ্যে থাকবেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন কাঠামোর সুবিধার আওতায় আসার কথা বলা হয়েছে।

তবে নতুন মূল বেতন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা, পেনশনসহ অন্যান্য সুবিধা কীভাবে পুনর্নির্ধারিত বা সমন্বিত হবে—এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে জানতে গেজেটের পূর্ণাঙ্গ প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে

গেজেট প্রকাশের পর কী হবে?

গেজেট প্রকাশের পরই নতুন পে-স্কেলের বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট হবে। এর মধ্যে থাকবে—

  • কোন তারিখ থেকে নতুন বেতন কার্যকর হবে;
  • কোন গ্রেডে কত মূল বেতন নির্ধারিত হয়েছে;
  • ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি;
  • ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার নতুন হার;
  • পেনশন ও অবসর সুবিধায় এর প্রভাব;
  • বকেয়া বা এরিয়ার বেতন কীভাবে সমন্বয় হবে;
  • সরকারি দপ্তরগুলো কীভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে।

অর্থাৎ, গেজেটই হবে নতুন পে-স্কেলের বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দলিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গেজেটের ভাষা ও শর্তই প্রাধান্য পাবে।

এখন মূল অপেক্ষা এসআরও নম্বরের

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের বিভিন্ন সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা হলেও প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তা পিছিয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে ১০ সেপ্টেম্বরকে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল; তবে এটি ছিল সম্ভাব্য সময়সূচি, চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা নয়।

৯ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে। তাই ভেটিং দ্রুত শেষ হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরার পর এসআরও নম্বর প্রদান এবং গেজেট প্রকাশই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষার বিষয়

শেষ কথা

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেলের ক্ষেত্রে এখন আর নতুন করে বেতন কাঠামো নির্ধারণ বা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষা নেই। অনুমোদন হয়েছে, খসড়া রেজল্যুশন বিজি প্রেসের প্রক্রিয়া পার হয়েছে এবং এখন আইনগত যাচাই চলছে। ভেটিং শেষ হওয়ার পর এসআরও নম্বর দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে—এটাই বর্তমান প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ।

ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রশ্ন—“নতুন পে-স্কেলের গেজেট কবে?”—এর উত্তর এখন মূলত নির্ভর করছে শেষ মুহূর্তের আইনগত যাচাই ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার ওপর। তবে বর্তমান অগ্রগতি বলছে, গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া সত্যিই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে

নোট: ১০ সেপ্টেম্বরকে সম্ভাব্য প্রকাশের তারিখ হিসেবে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে নিশ্চিত গেজেট প্রকাশের তারিখ হিসেবে ধরা উচিত নয়। চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য হবে সরকারি প্রজ্ঞাপন/এসআরও প্রকাশের পর।

admin

আলামিন মিয়া, একজন ব্লগার, ডিজিটাল মার্কেটার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার। ব্লগিংকরছি প্রায় ৭ বছর যাবৎ। বিভিন্ন অনলাইন সেবা হাতের কাছে পেতে নির্দেশনা ও পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করা হয় যা আপনি খুব সহজেই এই ওয়েবসাইট হতে পেতে পারেন। যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য প্রয়োজন হয় বা পরামর্শ থাকে তবে মেইল করুন admin@tricksboss.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *