বিডি সার্ভিস রুলস

পেনশনে যাওয়ার পর বিয়ে করলে স্ত্রী কি পারিবারিক পেনশন পাবেন? সরকারি বিধিতে যা বলা আছে

পেনশনে যাওয়ার পর বিয়ে করা স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পর পারিবারিক পেনশন পাবেন কি না—এ নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের মত রয়েছে। কেউ বলছেন, পেনশনে যাওয়ার আগেই স্ত্রীকে উত্তরাধিকারী/নমিনি হিসেবে নির্ধারণ করতে হয়, তাই অবসরের পর বিয়ে করলে নতুন স্ত্রী কোনোভাবেই পেনশন পাবেন না। আবার বাস্তবে এমন আবেদনও দেখা যাচ্ছে, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর মৃত্যুর পর পেনশনে যাওয়ার পরে বিবাহিত স্ত্রী পারিবারিক পেনশনের জন্য আবেদন করছেন।

তবে সরকারি নথি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি শুধু ‘নমিনি’ নির্ধারণের ওপর নির্ভরশীল নয়। কোন সময়ে বিবাহ হয়েছে এবং সেটি পেনশন ভোগরত অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ কি না—এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘পেনশনের নমিনি’ না থাকলে কি স্ত্রী পেনশন পাবেন না?

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি রয়েছে।

সরকারি পেনশন নথিতে পারিবারিক পেনশনের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী মনোনয়নের বিধান রয়েছে। পুরোনো অর্থ বিভাগের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট চাকরিতে থাকাকালীন অথবা পরবর্তীতে যে কোনো সময় পরিবারের এক বা একাধিক সদস্যকে পারিবারিক পেনশনের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষের উত্তরাধিকারী মনোনীত করা যেতে পারে।

অর্থাৎ, শুধু এই যুক্তি দেওয়া যে—“চাকরিতে থাকতেই নমিনি করতে হয়, পরে বিয়ে করলে সেই স্ত্রী কখনোই পেনশন পাবেন না”—তা সরাসরি সরকারি বিধির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অবসরের পরে যে কোনো বিবাহিত স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারিবারিক পেনশন পেয়ে যাবেন। এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান রয়েছে।

পেনশন ভোগরত অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করলে কী হবে?

সরকারি পেনশন-সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি নথিতে প্রশ্ন করা হয়েছে—“পেনশন ভোগরত অবস্থায় ২য় বিবাহ করলে ২য় স্ত্রী/স্বামী পারিবারিক পেনশন পাবেন কি?”

এর উত্তরে বলা হয়েছে, পেনশন ভোগরত অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ করলে পেনশনারের মৃত্যুর পর সেই দ্বিতীয় স্ত্রী/স্বামী পারিবারিক পেনশন প্রাপ্য হবেন না। এই সিদ্ধান্তের সূত্র হিসেবে অর্থ বিভাগের ৮ মার্চ ২০২১ তারিখের প্রজ্ঞাপনের উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি অবসর নিয়ে পেনশন ভোগ করছেন এবং সেই সময় তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন—তাহলে পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর ওই দ্বিতীয় স্ত্রীকে পারিবারিক পেনশন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি বিধিতে স্পষ্ট বাধা রয়েছে।

তাহলে অবসর নেওয়ার পর প্রথমবার বিয়ে করলে কী হবে?

এখানেই আপনার অফিসের ঘটনাটির আসল গুরুত্ব।

যদি কোনো পুরুষ সরকারি কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় অবিবাহিত ছিলেন, এরপর অবসর গ্রহণ করেন এবং পেনশন ভোগরত অবস্থায় প্রথমবার বিয়ে করেন, তাহলে সেটিকে সরাসরি “দ্বিতীয় বিবাহ” বলা যাবে না।

কিন্তু ওই স্ত্রী পারিবারিক পেনশনের জন্য যোগ্য কি না—সেটি নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট পেনশন বিধি, বিবাহের তারিখ, পেনশন মঞ্জুরির অবস্থা, পিপিওতে থাকা তথ্য এবং মৃত্যুর সময়কার বৈবাহিক/উত্তরাধিকার পরিস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে।

কারণ সরকারি নথিতে আবার বলা হয়েছে, অবসর গ্রহণের পর পেনশনার মারা গেলে তার পরিবার/মনোনীত উত্তরাধিকারী পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে।

সুতরাং “অবসরের পরে বিয়ে = স্ত্রী কোনোভাবেই পেনশন পাবেন না”—এমন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

তবে দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে বিধান স্পষ্ট

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে।

পরিস্থিতি–১: চাকরিরত অবস্থায় বিয়ে করেছেন

স্ত্রী বিদ্যমান পারিবারিক পেনশন বিধির আওতায় থাকবেন, অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে।

পরিস্থিতি–২: অবসর নিয়ে পেনশন ভোগ করার পর প্রথমবার বিয়ে করেছেন

এক্ষেত্রে কেবল “নমিনি করা হয়নি” যুক্তিতে আবেদন বাতিল করা যাবে কি না, তা আলাদাভাবে বিধি দেখে নির্ধারণ করতে হবে। বিবাহের প্রকৃতি ও পেনশন-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

পরিস্থিতি–৩: আগের স্ত্রী থাকা অবস্থায়/আগের বিবাহের পর পেনশন ভোগরত অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন

এক্ষেত্রে সরকারি বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট—পেনশনারের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় স্ত্রী/স্বামী পারিবারিক পেনশন প্রাপ্য হবেন না।

শুধু ‘নমিনি’ নয়, উত্তরাধিকারী হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

পেনশন সংক্রান্ত সরকারি নথিতে পারিবারিক পেনশনের জন্য উত্তরাধিকারী মনোনয়নের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে পেনশনারের মৃত্যুর পর স্ত্রী/স্বামীর বৈবাহিক অবস্থা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও আছে।

এ কারণে কোনো আবেদন এলে শুধু পেনশনারের পুরোনো নমিনি ফরম দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিবাহের তারিখ, বিবাহের ধরন, আগের স্ত্রী/স্বামীর অস্তিত্ব, পিপিও, উত্তরাধিকারী মনোনয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

আপনার অফিসের ঘটনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর স্ত্রী বর্তমানে এসে পারিবারিক পেনশন দাবি করেছেন এবং আবেদন করেছেন। সেই আবেদন ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র তদন্তের জন্য অফিসে এসেছে।

এ ধরনের ঘটনায় তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের প্রথম কাজ হওয়া উচিত—ওই নারী পেনশনারের সঙ্গে কবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং ওই বিবাহটি তার প্রথম বিবাহ নাকি দ্বিতীয় বিবাহ—তা নির্ধারণ করা।

এরপর দেখতে হবে—

  • পেনশনারের অবসরের তারিখ কত?
  • পেনশন মঞ্জুরির তারিখ কত?
  • বিবাহের তারিখ কত?
  • বিবাহের সময় তিনি ইতিপূর্বে বিবাহিত ছিলেন কি না?
  • সংশ্লিষ্ট স্ত্রীকে পেনশন নথিতে কোনো পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল কি না?
  • পিপিও/ডি-হাফে কী তথ্য রয়েছে?
  • পেনশনারের মৃত্যুর সময় বৈবাহিক অবস্থা কী ছিল?
  • কোনো পূর্ববর্তী স্ত্রী বা বৈধ উত্তরাধিকারী ছিলেন কি না?
  • আবেদনকারী স্ত্রী পুনর্বিবাহ করেছেন কি না—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তার সনদ কী?
  • সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগ/পেনশন বিধির কোন ধারা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

সরকারি দপ্তরের বাস্তব প্রক্রিয়াতেও অবসরভাতা ভোগরত অবস্থায় পেনশনারের মৃত্যু হলে পারিবারিক পেনশনের জন্য উত্তরাধিকার সনদ, নন-ম্যারিজ সার্টিফিকেট, পিপিও, ডি-হাফসহ বিভিন্ন নথি গ্রহণের কথা উল্লেখ রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

সুতরাং, “পেনশনে যাওয়ার আগে নমিনি না করলে পরে বিয়ে করা স্ত্রী কখনোই পেনশন পাবেন না”—এই বক্তব্যকে সরাসরি চূড়ান্ত বিধান হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না।

আবার বিপরীতভাবে “পেনশনে যাওয়ার পর বিয়ে করলেই স্ত্রী পারিবারিক পেনশন পাবেন”—এটিও সঠিক নয়।

সরকারি বিধিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, পেনশন ভোগরত অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ করা স্ত্রী/স্বামী পেনশনারের মৃত্যুর পর পারিবারিক পেনশন পাবেন না।

তাই আপনার অফিসের চলমান তদন্তের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আবেদনকারী নারীকে কখন এবং কোন বৈবাহিক অবস্থায় বিয়ে করেছিলেন?”

এই তথ্য নির্ধারণ না করে শুধু ‘নমিনি ছিল কি না’—এই একটি প্রশ্নের ভিত্তিতে আবেদন গ্রহণ বা বাতিল করা ঝুঁকিপূর্ণ।

সরকারি দপ্তরের জন্য বাস্তবসম্মত অবস্থান

এ ধরনের আবেদন এলে তদন্ত প্রতিবেদনে বিবাহের তারিখ, পেনশনের তারিখ, অবসরের তারিখ, পূর্ববর্তী বিবাহের তথ্য, পিপিও/ডি-হাফ এবং উত্তরাধিকারী মনোনয়ন পাশাপাশি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগীয় বিধানের আলোকে মতামত দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

কারণ সরকারি পেনশন ব্যবস্থায় পারিবারিক পেনশন শুধু একটি সাধারণ ‘নমিনি’ বিষয় নয়; যোগ্য উত্তরাধিকারী এবং প্রযোজ্য বৈবাহিক অবস্থার ওপরও এর অধিকার নির্ভর করে।

তাই আপনার অফিসে আসা আবেদনটি শুধু “পেনশনের পর বিয়ে হয়েছে” বলে বাতিল করার আগে—বিবাহটি প্রথম বিবাহ নাকি দ্বিতীয় বিবাহ, সেটি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

admin

আলামিন মিয়া, একজন ব্লগার, ডিজিটাল মার্কেটার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার। ব্লগিংকরছি প্রায় ৭ বছর যাবৎ। বিভিন্ন অনলাইন সেবা হাতের কাছে পেতে নির্দেশনা ও পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করা হয় যা আপনি খুব সহজেই এই ওয়েবসাইট হতে পেতে পারেন। যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য প্রয়োজন হয় বা পরামর্শ থাকে তবে মেইল করুন admin@tricksboss.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *