ডায়াবেটিসের ২১ ভুল ধারণা ও আসল সত্য : সচেতনতাই সুস্থতার চাবিকাঠি
ডায়াবেটিসকে বিশ্বজুড়ে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। বর্তমান বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। তবে রোগটি যতটা না বিপজ্জনক, তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক একে ঘিরে সমাজে প্রচলিত নানা রকম কুসংস্কার ও ভুল ধারণা। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক রোগীই ভুল জীবনযাত্রা বেছে নেন, যা তাদের স্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
ডায়াবেটিস নিয়ে সমাজে প্রচলিত এমন ২১টি প্রধান ভুল ধারণা এবং এর পেছনের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক সত্য উন্মোচন করেছেন দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক (ডাঃ) এ বি এম আব্দুল্লাহ।
ডায়াবেটিস রোগীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর সেই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রোগ ও নিরাময় সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণা
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিস কোনদিনও ভাল হয় না।
প্রকৃত সত্য: ডায়াবেটিসকে চিরজনমের রোগ বলা হলেও, কিছু নির্দিষ্ট রোগের কারণে (যেমন: এক্রোমেগালি, থাইরোটক্সিকোসিস, প্যানক্রিয়াটিক ডিজিজ, কুশিং সিনড্রোম) যে ডায়াবেটিস হয়, তাকে ‘সেকেন্ডারি ডায়াবেটিস’ বলে। মূল রোগের চিকিৎসা করলে এটি পুরোপুরি ভাল হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খাওয়ার কারণে ডায়াবেটিস হলে, ওষুধ বন্ধ করলে তা সেরে যায়। সঠিক নিয়মশৃঙ্খলা ও ওষুধে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ভুল ধারণা: একবার ডায়াবেটিসের ওষুধ শুরু করলে আর কখনো বন্ধ করা যাবে না।
প্রকৃত সত্য: এই ধারণা ঠিক নয়। স্থূলকায় বা অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিরা যদি ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, সঠিক ডায়েট ও নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ বন্ধও করা যেতে পারে।
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা তাড়াতাড়ি মারা যান।
প্রকৃত সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন বাঁচা সম্ভব। কেবল অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণেই শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়।
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিস সারা জীবনের সঙ্গী, এটি থেকে আর পরিত্রাণ পাওয়া যায় না।
প্রকৃত সত্য: সঠিক নিয়ম, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস ও সক্রিয় জীবনযাত্রা অবলম্বন করে ডায়াবেটিসকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস মুক্ত হওয়াও সম্ভব।
২. খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি বিষয়ক বিভ্রান্তি
ভুল ধারণা: ভাত বা কার্বোহাইড্রেট একেবারেই খাওয়া যাবে না।
প্রকৃত সত্য: ডায়াবেটিস হলে ভাত খাওয়া যাবে না—এটি ভুল। ভাত বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার পরিমাণ মতো মেপে খাওয়া যাবে। সাধারণত সকালে ও রাতে গমের রুটি এবং দুপুরে পরিমিত ভাত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ভুল ধারণা: কৃত্রিম চিনি বা সুইটনার ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যাবে।
প্রকৃত সত্য: সাধারণ চিনির বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম চিনি ব্যবহার করা গেলেও তা হতে হবে পরিমিত। অতিরিক্ত মাত্রায় কৃত্রিম চিনি ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও উচিত নয়।
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিস রোগীরা ফল খেতে পারেন না।
প্রকৃত সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ডায়াবেটিস রোগীরা কলা, আপেল, কমলা, আঙ্গুরসহ যেকোনো ফলই খেতে পারবেন, তবে তা অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে হতে হবে।
ভুল ধারণা: মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয়।
প্রকৃত সত্য: সরাসরি মিষ্টি খাওয়ার সাথে ডায়াবেটিস হওয়ার কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই। মিষ্টি না খেয়েও ডায়াবেটিস হতে পারে। মূলত পারিবারিক ইতিহাস (বংশগত), ওজন বৃদ্ধি, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং অলস জীবনযাপন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে তাই বলে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়।
ভুল ধারণা: করলা, মেথি বা নিমপাতার মতো তিতা জিনিস খেলে ডায়াবেটিস সেরে যায়।
প্রকৃত সত্য: তিতা খাবার রক্তে গ্লুকোজ কমায়—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা প্রমাণ নেই। এগুলো ডায়াবেটিস নিরাময় বা গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করে না।
ভুল ধারণা: বাজারে প্রাপ্ত সাধারণ চিনিমুক্ত (Sugar-Free) খাবার বা ডায়াবেটিক পানীয় ইচ্ছেমতো খাওয়া যায়।
প্রকৃত সত্য: বাজারে চটকদার বিজ্ঞাপনে বিক্রীত ডায়াবেটিক কোক, পেপসি, সন্দেশ বা বিস্কুট ডায়াবেটিস রোগীরা মাঝেমধ্যে মিষ্টির বিকল্প হিসেবে সামান্য খেতে পারেন, তবে এগুলো সব সময় বা ইচ্ছেমতো খাওয়া একেবারেই ঠিক নয়।
৩. চিকিৎসা ও ওষুধের সঠিক তথ্য
ভুল ধারণা: মিষ্টিজাতীয় সিরাপ বা ওষুধ খেলে ডায়াবেটিস বাড়বে।
প্রকৃত সত্য: কিছু সিরাপে স্বাদের জন্য সামান্য স্যাকারিন বা সুগার দেওয়া থাকে। তবে তা অত্যন্ত সামান্য হওয়ায় ডায়াবেটিস বাড়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে। রোগের চিকিৎসায় ওষুধটি খাওয়া বেশি জরুরি।
ভুল ধারণা: হোমিওপ্যাথিক বা হার্বাল মেডিসিনে ডায়াবেটিস ভাল হয়।
প্রকৃত সত্য: এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো ৩টি ‘D’:
Diet (খাদ্য নিয়ন্ত্রণ): ৬০-৮০ ভাগ রোগী শুধু খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করেই ভালো থাকেন।
Discipline (শৃঙ্খলা): সুশৃঙ্খল জীবনযাপন।
Drug (ওষুধ/ইনসুলিন): খুব কম সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধের প্রয়োজন হয়।
ভুল ধারণা: রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে এলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া যায়।
প্রকৃত সত্য: রোগীরা মনে করেন কোনো সমস্যা না থাকলে ওষুধ দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবে ওষুধের কারণেই সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওষুধ বন্ধ করলে সুগারের মাত্রা আবার বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
ভুল ধারণা: ওষুধ খাওয়ার পর যত খুশি মিষ্টি খাওয়া যায়।
প্রকৃত সত্য: এটি অত্যন্ত মারাত্মক একটি ধারণা। ওষুধ খাওয়ার মানে এই নয় যে ইচ্ছেমতো মিষ্টি খাওয়া যাবে। মাঝেমধ্যে সামান্য খাওয়া যেতে পারে। আবার ডায়াবেটিস কমানোর জন্য স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাবার খাওয়া একেবারে বন্ধ করে দেওয়াও ঠিক নয়।
৪. ইনসুলিন নিয়ে ভীতি ও বাস্তবতা
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিসে ইনসুলিন হলো সর্বশেষ চিকিৎসা।
প্রকৃত সত্য: ইনসুলিন মানেই রোগীর অবস্থা মরণাপন্ন—এমন ধারণা ভুল। গর্ভাবস্থায়, অপারেশনের সময়, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, গুরুতর সংক্রমণ কিংবা কিডনি ও যকৃতের জটিলতায় ইনসুলিন সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য। অবস্থার উন্নতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে আবার মুখে খাওয়ার ওষুধে ফিরে আসা সম্ভব।
ভুল ধারণা: একবার ইনসুলিন শুরু করলে সারা জীবনই তা নিতে হবে।
প্রকৃত সত্য: সাময়িক প্রয়োজনে (যেমন গর্ভাবস্থা বা অস্ত্রোপচারের সময়) ইনসুলিন লাগলে পরে তা বন্ধ করে আবার ওষুধ খাওয়া যায়। তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিস এবং লিভার-কিডনির গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে ইনসুলিন লাগতে পারে।
৫. সামাজিক ও অন্যান্য দৈনন্দিন ধারণা
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিস একটি ছোঁয়াচে রোগ।
প্রকৃত সত্য: ডায়াবেটিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটি মূলত বংশগত বা জেনেটিক কারণে এবং ত্রুটিপূর্ণ জীবনযাত্রার কারণে হয়ে থাকে।
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিস রোগীরা রক্তদান করতে পারেন না।
প্রকৃত সত্য: ডায়াবেটিস রোগী যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন এবং অন্য কোনো বড় স্বাস্থ্য সমস্যা না থাকে, তবে তিনি অনায়াসেই রক্তদান করতে পারেন।
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের গর্ভধারণ করা ঠিক নয় এবং বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে না।
প্রকৃত সত্য: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে গর্ভধারণে কোনো বাধা নেই। এমনকি সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ালেও শিশুর কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না।
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিস রোগীরা কখনোই রোজা রাখতে পারবেন না।
প্রকৃত সত্য: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে রোগীরা অবশ্যই রোজা রাখতে পারবেন। রোজা মূলত খাদ্য নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। রোজা রেখে দিনের বেলায় রক্তের সুগার মাপা যায় এবং প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশনও নেওয়া যায়, এতে রোজা ভঙ্গ হয় না।
ভুল ধারণা: ডায়াবেটিস রোগীর ডায়রিয়া হলে ওরস্যালাইন খাওয়া যাবে না।
প্রকৃত সত্য: ওরস্যালাইনে সামান্য গ্লুকোজ থাকে যা ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা দূর করতে জরুরি। এতে ডায়াবেটিসের বড় কোনো ক্ষতি হয় না, তাই ডায়রিয়া হলে অবশ্যই ওরস্যালাইন খেতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ
অধ্যাপক (ডাঃ) এ বি এম আব্দুল্লাহর মতে, ডায়াবেটিসকে ভয় না পেয়ে একে নিয়ন্ত্রণে রাখাই আসল বুদ্ধিমত্তা। সমাজে প্রচলিত এসব ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হয়ে এসে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা এবং যেকোনো প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জীবনযাপন করাই সুস্থ থাকার একমাত্র উপায়।

