১ জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক ২০২৬ । ক্যাশলেস অর্থনীতির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় পদক্ষেপ
দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বাড়াতে এবং একটি সম্পূর্ণ ক্যাশলেস (নগদবিহীন) সমাজ গঠনে বড় ধরনের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে দেশের যেকোনো প্রান্তের কেনাকাটা বা সেবা মূল্য পরিশোধে ‘বাংলা কিউআর’ (Bangla QR) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
এই নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) কিংবা যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ ব্যবহার করে গ্রাহকেরা একে অপরের অ্যাকাউন্টে বা মার্চেন্ট পেমেন্টে নির্বিঘ্নে টাকা পাঠাতে ও গ্রহণ করতে পারবেন।
জুনের মধ্যে ট্রায়াল রান ও গভর্নরের আহ্বান
সম্প্রতি খুলনায় আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এই ঐতিহাসিক ঘোষণার কথা জানান। তিনি বলেন, সরকারের ডিজিটাল ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ার উদ্যোগকে সফল করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১ জুলাই থেকে এটি বাধ্যতামূলক করার আগে, আগামী জুনের মধ্যে দেশের সকল স্তরের গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের অন্তত একবার হলেও ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে লেনদেন করার আহ্বান জানিয়েছেন গভর্নর। এতে করে পুরো ব্যবস্থার একটি প্রাথমিক ট্রায়াল সম্পন্ন হবে এবং ব্যবহারকারীদের মাঝে সচেতনতা তৈরি হবে।
‘বাংলা কিউআর’ কী এবং কীভাবে কাজ করবে?
বর্তমানে বিকাশ, নগদ বা বিভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব আলাদা আলাদা কিউআর কোড থাকে, যা এক অ্যাপ দিয়ে অন্য অ্যাপে স্ক্যান করা যায় না। কিন্তু ‘বাংলা কিউআর’ হলো একটি সমন্বিত ও সর্বজনীন (Interoperable) কিউআর কোড ব্যবস্থা।
সহজ ভাষায়: এখন থেকে একটি দোকানে মাত্র একটি ‘বাংলা কিউআর’ কোড থাকলেই চলবে। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা যেকোনো ব্যাংকে (যেমন- ব্র্যাক, সিটি, ইসলামী ব্যাংক ইত্যাদি) থাকুক না কেন, তারা সেই একটি কিউআর কোড স্ক্যান করেই মুহূর্তের মধ্যে পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারবেন।
কেন এই সিদ্ধান্ত? অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব
খুলনার ওই মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গভর্নর এই সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ও সুবিধার কথা তুলে ধরেন:
নোট ছাপানোর খরচ হ্রাস: বর্তমানে কাগজের নতুন নোট তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাজারে তা সচল রাখতে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করতে হয়। ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন বাড়লে কাগজের নোটের ওপর নির্ভরতা কমবে, যা সরকারের শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় করবে।
লেনদেনে স্বচ্ছতা ও রাজস্ব বৃদ্ধি: প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেনের হিসাব কেন্দ্রীয় সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসবে, অবৈধ লেনদেন রোধ হবে এবং সরকারের রাজস্ব (ভ্যাট/ট্যাক্স) আদায় অনেক সহজ ও কার্যকর হবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্তি: ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শপিং মল—সব জায়গার ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা কোনো বাড়তি মেশিনের (POS Machine) খরচ ছাড়াই শুধু একটি কাগজের কিউআর কোড দিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন।
দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন: খুচরা টাকা বা জাল নোটের ঝামেলা ছাড়াই সাধারণ মানুষ দ্রুত ও নিরাপদে কেনাকাটা করতে পারবেন।
পরিবর্তনের হাওয়া দেশের ব্যাংকিং ও কৃষি খাতে
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ব্যবসায়ী ও অংশীজনেরা ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং কৃষি অর্থনীতি নিয়ে তাদের নানামুখী মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষি খাতের কেনাকাটায় ‘বাংলা কিউআর’ ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও খুব দ্রুত আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় চলে আসবে।
১ জুলাই থেকে এই সিদ্ধান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের সামগ্রিক পেমেন্ট ইকোসিস্টেম এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর

