১০ লাখ বা তদূর্ধ্ব টাকার নগদ লেনদেন: এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে রিপোর্ট পাবে বিএফআইইউ
ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে নজরদারি আরও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এখন থেকে কোনো ব্যাংক হিসাবে একদিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন (জমা বা উত্তোলন) হলে, সেই তথ্য পরবর্তী সপ্তাহের ৩ কার্যদিবসের মধ্যেই বিএফআইইউ-তে জমা দিতে হবে।
সম্প্রতি বিএফআইইউ থেকে প্রকাশিত এক সার্কুলার লেটারে (নং-১) দেশের সকল তফসিলি ব্যাংককে এই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যা গত ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে।
কী আছে নতুন নির্দেশনায়?
বিএফআইইউ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের আগের নিয়ম বলবৎ থাকলেও রিপোর্টিংয়ের সময়সীমায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সাপ্তাহিক রিপোর্ট: আগে এই রিপোর্ট সাধারণত মাসিক ভিত্তিতে দেওয়া হতো। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহের ‘নগদ লেনদেন রিপোর্ট’ বা সিটিআর (Cash Transaction Report) পরবর্তী সপ্তাহের ৩ কার্যদিবসের মধ্যে দাখিল করতে হবে।
লেনদেনের সীমা: একদিনে একই হিসাবে একক বা একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন করলে তা রিপোর্টের আওতায় আসবে।
বৈদেশিক মুদ্রাও অন্তর্ভুক্ত: কেবল দেশি টাকা নয়, সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। অনলাইন বা এটিএম বুথের মাধ্যমে করা নগদ লেনদেনও এর বাইরে নয়।
সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই নির্দেশনা মূলত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিপালনের জন্য। সাধারণ গ্রাহক যাদের আয়ের উৎস বৈধ, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ১. এটি কোনো নতুন কর বা অতিরিক্ত চার্জ নয়। ২. রিপোর্ট করার অর্থই গ্রাহককে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা নয়। ৩. এটি নিয়মিত তদারকির একটি অংশ যা মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়।
আইন লঙ্ঘনে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
সার্কুলারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সঠিক সময়ে সিটিআর দাখিলে ব্যর্থ হলে কিংবা ভুল, অসম্পূর্ণ বা মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ‘মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কেন এই কড়াকড়ি?
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ১১ জানুয়ারি থেকে নতুন সময়সূচী কার্যকর হলেও, ১ থেকে ১০ জানুয়ারি ২০২৬ মেয়াদের পেন্ডিং রিপোর্টগুলোও দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনের কারণেই কি এমনটি করা হচ্ছে?
বিএফআইইউ (BFIU) সার্কুলারটিতে কোথাও ‘নির্বাচন’ শব্দটির উল্লেখ নেই। তবে এই ধরনের বড় অংকের নগদ লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পেছনে সাধারণত দুটি ভিন্ন দিক থাকতে পারে:
১. প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রেক্ষাপট (সার্কুলারের বক্তব্য):
বিএফআইইউ মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (FATF) অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে কাজ করে। সার্কুলারেও স্পষ্টভাবে ‘মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’ এবং ‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে কালো টাকার প্রবাহ রোধ এবং নগদ টাকার অস্বাভাবিক সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করা তাদের নিয়মিত কাজের অংশ।
২. রাজনৈতিক বা নির্বাচনী প্রেক্ষাপট (সাধারণ বিশ্লেষণ):
সাধারণত নির্বাচনের আগে বা পরের সময়ে বাজারে নগদ টাকার লেনদেন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা থাকে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে যে:
নির্বাচনী প্রচারণায় কালো টাকার ব্যবহার হচ্ছে কি না।
অবৈধভাবে অর্থ দেশের বাইরে পাচার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে কি না।
বড় অংকের নগদ টাকা তুলে ভোটের মাঠ প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না।
যদি বর্তমান সময়টি নির্বাচনের কাছাকাছি হয়ে থাকে, তবে বিএফআইইউ-এর এই ‘সাপ্তাহিক রিপোর্টিং’-এর সিদ্ধান্তকে অনেকেই নির্বাচনী নজরদারির অংশ হিসেবে মনে করতে পারেন। কারণ, মাসিক রিপোর্টের চেয়ে সাপ্তাহিক রিপোর্টে যে কোনো ‘অস্বাভাবিক লেনদেন’ অনেক দ্রুত ধরা পড়ে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।
সারসংক্ষেপ: প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া (যা ২০২০ সালের নিয়মেরই ফলো-আপ), তবে সময়কাল বিবেচনা করলে এটি নির্বাচনী বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ে অর্থনৈতিক অপরাধ দমনে সরকারের বাড়তি সতর্কতা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

