জমি-জমা সংক্রান্ত

আইনি জটিলতা এড়াতে জমি হস্তান্তরে অন্যতম মাধ্যম ‘হেবা-বিল-এওয়াজ’: জেনে নিন খুঁটিনাটি

মুসলিম আইনে জমি বা সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘হেবা’ বা সাধারণ দান একটি প্রচলিত শব্দ। তবে এর বাইরেও একটি বিশেষ আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, যা ‘হেবা-বিল-এওয়াজ’ বা ‘বিনিময় দান’ নামে পরিচিত। সাধারণ দানের চেয়ে এর প্রকৃতি ও আইনি ভিত্তি বেশ ভিন্ন। কোনো কিছুর বিনিময়ে বা প্রতিদানের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের এই আইনি প্রক্রিয়াটি দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে সঠিক নিয়ম ও আইনি বাধ্যবাধকতা না জানার কারণে অনেকেই পরবর্তীতে নানা জটিলতায় পড়েন।

জমি হস্তান্তরের এই বিশেষ দলিলটির আইনি সুবিধা, শর্ত ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

মূল ভিত্তিই হলো ‘এওয়াজ’ বা প্রতিদান

হেবা-বিল-এওয়াজের প্রধান শর্ত হলো ‘এওয়াজ’ বা প্রতিদান। সাধারণ হেবা বা দানে কোনো প্রতিদানের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু এখানে দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে কোনো বস্তু, অর্থ বা দায়ের বিনিময় ঘটতে হয়। যেমন—কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে দেনমোহরের বিপরীতে জমি লিখে দেন, কিংবা কেউ যদি পবিত্র কুরআন শরিফ, তসবিহ বা অন্য কোনো মূল্যবান বস্তুর বিনিময়ে কাউকে জমি দান করেন, তবে তা ‘হেবা-বিল-এওয়াজ’ হিসেবে গণ্য হবে। এখানে বিনিময়ের আর্থিক মূল্য বড় বিষয় নয়, বরং আইনিভাবে একটি বৈধ বিনিময় বা প্রতিদান সম্পন্ন হওয়াই মূল কথা।

রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাইরেও করা যায়

সাধারণ হেবা দলিল করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিকটাত্মীয়ের (যেমন: বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ইত্যাদি) সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু হেবা-বিল-এওয়াজের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি কেবল নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় ছাড়াও যে কোনো ব্যক্তিকে কোনো কিছুর বিনিময়ে এই দান করা সম্ভব। তবে এই প্রক্রিয়ায় দান করার পর গ্রহীতাকে অবশ্যই জমির ‘দখল’ বুঝিয়ে দিতে হবে। দখল হস্তান্তর না করলে এই দানটি আইনের চোখে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

দলিল প্রত্যাহারের সুযোগ নেই বললেই চলে

সাধারণ হেবা বা দানের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ শর্তে বা আদালতের মাধ্যমে দলিল বাতিলের সুযোগ থাকলেও, হেবা-বিল-এওয়াজ দলিলের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত কঠিন। যেহেতু এখানে দাতা নির্দিষ্ট প্রতিদান বা ‘এওয়াজ’ গ্রহণ করার পর জমি হস্তান্তর করেন, তাই আইনগতভাবে এটি একটি ‘বিক্রয়’ বা চুক্তির সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দাতা জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পর এবং প্রতিদান পেয়ে যাওয়ার পর সাধারণত এই দলিল আর প্রত্যাহার বা বাতিল করতে পারেন না।

রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক: ২০০৫ সালের পর মৌখিক সুযোগ নেই

২০০৫ সালের আইন সংশোধনের পর থেকে বাংলাদেশে যেকোনো ধরণের হেবা বা দান সংক্রান্ত দলিল রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমানে মৌখিক কোনো বিনিময় দানের আইনি গ্রহণযোগ্যতা নেই। হেবা-বিল-এওয়াজ সম্পন্ন করতে হলে অবশ্যই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সরকারি নিয়ম মেনে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে। এছাড়া, রেজিস্ট্রেশনের সময় দলিলের ভেতরে ঠিক কীসের বিনিময়ে (যেমন: দেনমোহর পরিশোধ বা নির্দিষ্ট কোনো বস্তু) এই সম্পত্তি হস্তান্তর করা হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

খরচ কম এবং দ্রুত নামজারি (মিউটেশন) জরুরি

সাধারণ সাফ-কবলা বা বিক্রয় দলিলের তুলনায় হেবা-বিল-এওয়াজ দলিলে রেজিস্ট্রেশন খরচ অনেক সাশ্রয়ী। ফলে দেনমোহর পরিশোধ বা অন্যান্য দায় মুক্তির জন্য এটি একটি চমৎকার অর্থনৈতিক ও আইনি মাধ্যম। তবে দলিল রেজিস্ট্রেশন করার পর গ্রহীতার প্রথম ও প্রধান কাজ হলো দ্রুত সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে ‘নামজারি’ বা মিউটেশন করিয়ে নেওয়া। নামজারি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি খতিয়ান বা রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয় না, যার ফলে মালিকানা পূর্ণতা পায় না।

ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়াতে সেরা মাধ্যম

পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন, স্ত্রীর মোহরানা বুঝিয়ে দেওয়া কিংবা বিশ্বস্ত কাউকে প্রতিদানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করার জন্য হেবা-বিল-এওয়াজ একটি শক্তিশালী আইনি পথ। সঠিক নিয়ম মেনে, স্পষ্ট প্রতিদান উল্লেখ করে এবং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদন করলে ভবিষ্যতে ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে কোনো প্রকার বিরোধ বা মামলা-মোকদ্দমার সুযোগ থাকে না।

admin

আলামিন মিয়া, একজন ব্লগার, ডিজিটাল মার্কেটার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার। ব্লগিংকরছি প্রায় ৭ বছর যাবৎ। বিভিন্ন অনলাইন সেবা হাতের কাছে পেতে নির্দেশনা ও পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করা হয় যা আপনি খুব সহজেই এই ওয়েবসাইট হতে পেতে পারেন। যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য প্রয়োজন হয় বা পরামর্শ থাকে তবে মেইল করুন admin@tricksboss.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *