কিডনির সুরক্ষায় সচেতনতা: ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধি মানেই কি শেষ, নাকি সঠিক নিয়মে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল পরিভাষাগুলোর মধ্যে ‘ক্রিয়েটিনিন’ (Creatinine) এমন একটি নাম, যা শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে এক অজানা আতঙ্ক ভর করে। ল্যাবরেটরির রিপোর্টে এই সূচকটি সামান্য এদিক-ওদিক হলেই রোগী এবং তার পরিবারের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র মানসিক চাপ। অনেকেই একে ‘নীরব ঘাতক’ ভেবে ভুল করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ভয় না পেয়ে ক্রিয়েটিনিন বাড়ার কারণ এবং তা নিয়ন্ত্রণের সঠিক উপায় জানলে এই পরিস্থিতি চমৎকারভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ইউরোলজি ও ইউরোগাইনোকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী সম্প্রতি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজবোধ্য কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন।
ক্রিয়েটিনিন আসলে কী?
খুব সহজ ভাষায়, ক্রিয়েটিনিন হলো আমাদের শরীরের একটি স্বাভাবিক বর্জ্য পদার্থ। প্রতিদিন আমাদের শরীরের মাংসপেশি যখন কাজ করে, তখন এই বর্জ্যটি তৈরি হয়ে রক্তে মেশে। একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক কিডনির প্রধান কাজ হলো রক্ত থেকে এই ক্রিয়েটিনিন ছেঁকে নিয়ে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেওয়া।
যদি কিডনির কার্যক্ষমতা কোনো কারণে কমে যায়, তবে সে রক্ত থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্রিয়েটিনিন বের করতে পারে না। ফলে রক্তে এর মাত্রা বাড়তে থাকে। অর্থাৎ, রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা মূলত কিডনি কতটা সুস্থ আছে তা পরিমাপের একটি অন্যতম সূচক।
রক্তের স্বাভাবিক মাত্রা কত?
লিঙ্গ ও মাংসপেশির গঠন ভেদে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের স্বাভাবিক মাত্রায় কিছুটা ভিন্নতা থাকে:
পুরুষের জন্য: ০.৭ থেকে ১.২ mg/dL
নারীর জন্য: ০.৫ থেকে ১.০ mg/dL
রিপোর্টে এই মাত্রার চেয়ে বেশি দেখা গেলে ধরে নেওয়া হয় কিডনি তার স্বাভাবিক গতিতে কাজ করতে পারছে না।
যেসব কারণে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বাড়তে পারে
অনেকেই মনে করেন ক্রিয়েটিনিন বাড়া মানেই কিডনি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া, যা একটি ভুল ধারণা। সাময়িকভাবেও বেশ কিছু কারণে এর মাত্রা বাড়তে পারে: ১. অতিরিক্ত রেড মিট গ্রহণ: গরু বা মহিষের মাংস অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে।
২. দুগ্ধজাত খাবার: অতিরিক্ত মাত্রায় ডেয়ারি প্রোডাক্ট বা দুগ্ধজাত খাবার খেলে।
৩. ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা: শরীরে পর্যাপ্ত পানির অভাব হলে কিডনি বর্জ্য অপসারণ করতে বাধা পায়।
৪. অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম: হঠাৎ খুব বেশি ভারী ব্যায়াম বা কঠোর পরিশ্রম করলে মাংসপেশির ভাঙনের ফলে ক্রিয়েটিনিন সাময়িকভাবে বাড়তে পারে।
নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকরী উপায়
ডা. তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী জানান, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই কমিয়ে আনা এবং কিডনির ভবিষ্যৎ ক্ষতি ধীর করা সম্ভব। এর জন্য করণীয়সমূহ:
প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ: খাদ্য তালিকায় প্রাণিজ প্রোটিনের (বিশেষ করে লাল মাংস) পরিমাণ কমিয়ে শাকসবজির পরিমাণ বাড়াতে হবে।
ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার: খাবারে ফাইবারের বা আঁশের পরিমাণ বাড়ালে তা শরীর থেকে টক্সিন বা ক্ষতিকর বর্জ্য বের করে দিতে সাহায্য করে।
পরিমিত পরিশ্রম: অতিরিক্ত ও ক্লান্তিকর শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হবে।
নিয়মিত পরীক্ষা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ‘কিডনি ফাংশন টেস্ট’ (KFT) করানো উচিত।
“ইউরোলজিস্ট হয়ে কেন এই পোস্ট?” — সমালোচনার জবাব
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন পাঠকের প্রশ্নের জবাবে ডা. তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পাঠক প্রশ্ন করেছিলেন— তিনি নেফ্রোলজিস্ট (কিডনি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) না হয়েও কেন কিডনি ও ক্রিয়েটিনিন নিয়ে পোস্ট করছেন?
এর জবাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিধি স্পষ্ট করে তিনি জানান, ইউরোলজি এবং নেফ্রোলজি মূলত একই কয়েনের ওপিঠ এবং একে অপরের পরিপূরক। ইউরোলজিস্টরা কিডনি, মূত্রনালী, মূত্রথলির সার্জারি এবং সামগ্রিক ইউরোজেনিটাল সিস্টেমের চিকিৎসা করেন। ফলে কিডনির কার্যক্ষমতা বা ক্রিয়েটিনিনের ওঠানামার সাথে ইউরোলজির সম্পর্ক সরাসরি। একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং দায়িত্বশীল চিকিৎসক হিসেবে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না করে সচেতন করা এবং সঠিক পথ দেখানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। ভয় নয়, সচেতনতাই এখানে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বিশেষ ঘোষণা ও চেম্বার তথ্য: ডা. তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী জানিয়েছেন, পরবর্তী পর্বে কিডনি রোগীদের জন্য কোন কোন খাবার নিরাপদ এবং কোনগুলো ক্ষতিকর, তার একটি সহজ খাদ্য তালিকা (Diet Chart) প্রকাশ করা হবে।
ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশের রোগীরা সরাসরি তাঁর চেম্বারে এসে পরামর্শ নিতে পারবেন। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগী, যাদের যাতায়াতে সমস্যা রয়েছে, তারা আগে থেকে রেজিস্ট্রেশন করে নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে অনলাইন ভিডিও কনসালটেশনের মাধ্যমে বিস্তারিত পরামর্শ নিতে পারবেন।
যোগাযোগের সময়: সকাল ৯:০০ টা থেকে বিকাল ৪:০০ টা পর্যন্ত (শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত)।
হেল্পলাইন নম্বর: 01989997180

