জমি-জমা সংক্রান্ত

জমির দলিলে ‘গং’, ‘পিং’ বা ‘নিং’ মানে কী? আইনি জটিলতা এড়াতে জেনে নিন দলিলের কঠিন শব্দের সহজ অর্থ

জমি কেনাবেচা বা মালিকানা প্রমাণের প্রধান ভিত্তি হলো দলিল। কিন্তু দলিলে ব্যবহৃত অনেক শব্দ আমাদের দৈনন্দিন ভাষার চেয়ে ভিন্ন এবং অনেকটা প্রাচীন বা পারিভাষিক। সঠিক অর্থ না জানার কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষ দলিলে কী লেখা আছে তা বুঝতে পারেন না, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা বা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভূমি ব্যবস্থাপনা ও দলিল নিবন্ধনের কাজে বহুল ব্যবহৃত এমন ৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের সহজ অর্থ নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

দলিলে ব্যবহৃত সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ:

জমির মালিকানা বা পরিচয় শনাক্তে কিছু সংক্ষিপ্ত শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন:

  • পিং ও জং: দলিলে ‘পিং’ মানে পিতা এবং ‘জং’ মানে স্বামী।

  • গং ও বিং: ‘গং’ বলতে অন্যান্য অংশীদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝায় এবং ‘বিং’ মানে বিস্তারিত।

  • নিং ও বং: নিরক্ষর ব্যক্তি বোঝাতে ‘নিং’ এবং নিরক্ষর ব্যক্তির পক্ষে যিনি স্বাক্ষর করেন তাকে ‘বং’ বা বাহক বলা হয়।

  • সাং ও মং: ‘সাং’ মানে সাকিন বা ঠিকানা এবং ‘মং’ বলতে মোট পরিমাণ বোঝায়।

  • খং ও দং: ‘খং’ মানে খতিয়ান নম্বর এবং ‘দং’ বলতে দখলকারীকে বোঝানো হয়।

জমির ধরন ও প্রকৃতি বুঝবেন যেভাবে:

জমি উঁচু না নিচু, নাকি জলাশয়—তা বুঝতে নিচের শব্দগুলো খেয়াল রাখা জরুরি:

  • নাল ও চালা: চাষযোগ্য জমিকে ‘নাল’ এবং উঁচু চাষযোগ্য জমিকে ‘চালা’ বলা হয়।

  • ডাঙ্গা ও কান্দা: উঁচু চাষযোগ্য জমিকে ‘ডাঙ্গা’ এবং নদীর পাড়ের উর্বর উঁচু জমিকে ‘কান্দা’ বলে।

  • সিকস্তি ও পয়স্তি: নদী ভাঙনে জমি বিলীন হওয়াকে ‘সিকস্তি’ এবং পলি জমে চর জেগে ওঠাকে ‘পয়স্তি’ বলা হয়।

  • খাসজমি: সরকারি মালিকানাধীন জমি।

  • পতিত: চাষযোগ্য কিন্তু সাময়িকভাবে পরিত্যক্ত জমি।

  • চান্দিনা: হাটবাজারের জন্য নির্ধারিত অকৃষি জমি।

সীমানা ও মানচিত্র সংক্রান্ত শব্দ:

  • হাল ও সাবেক দাগ: বর্তমানে প্রচলিত দাগ নম্বরকে ‘হাল’ এবং আগের বা পুরনো দাগ নম্বরকে ‘সাবেক’ বলা হয়।

  • বাটা দাগ: বড় একটি দাগ বিভক্ত করে নতুন নম্বর সৃষ্টি করলে তাকে ‘বাটা দাগ’ বলে।

  • ছুট দাগ: জরিপের সময় ভুলবশত কোনো দাগ বাদ পড়লে তাকে ‘ছুট’ বা ‘ছুটা দাগ’ বলা হয়।

  • সিট: মৌজা মানচিত্রের একটি অংশ।

মালিকানা ও আইনি পরিভাষা:

  • মৌরশী: পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি।

  • এওয়াজ: জমির পরিবর্তে জমি বা বিনিময়।

  • কায়েমি: জমির ওপর স্থায়ী অধিকার যা সহজে বাতিলযোগ্য নয়।

  • তসদিক: দলিল বা তথ্যের সত্যতা যাচাই।

  • জমাবন্দী: ভূমি অফিসে সংরক্ষিত জমি ও খাজনার রেকর্ড।

  • আমলনামা: জমিদার কর্তৃক প্রদত্ত বন্দোবস্তের দলিল।

  • লাখেরাজ: করমুক্ত জমি।

কেন এসব শব্দের অর্থ জানা প্রয়োজন?

ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলিলের প্রতিটি শব্দের আইনি গুরুত্ব রয়েছে। যেমন—দলিলে ‘গং’ শব্দটি থাকলে বুঝতে হবে জমিটির আরও মালিক রয়েছে। আবার ‘সাবক দাগ’ ও ‘হাল দাগ’ না মিললে জমির অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। দলিলে ব্যবহৃত এই ভাষাগুলো মূলত ফারসি ও বাংলার এক সংমিশ্রণ, যা ব্রিটিশ ও মুঘল আমল থেকে চলে আসছে।

পরামর্শ:

জমি কেনা বা বাটোয়ারা করার সময় দলিলটি ভালো করে পড়ুন। যদি কোনো শব্দের অর্থ স্পষ্ট না হয়, তবে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা ভূমি অফিসের সহায়তায় তা বুঝে নিন। সামান্য একটি শব্দের ভুল ব্যাখ্যার কারণে আপনার স্বপ্নের ভিটেমাটি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে পড়তে হতে পারে।

ভূমি সংক্রান্ত তথ্যের প্রয়োজনে এই তালিকাটি সংগ্রহে রাখতে পারেন অথবা অন্যদের সচেতন করতে শেয়ার করতে পারেন। জমি-জমা সংক্রান্ত যেকোনো জিজ্ঞাসায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

admin

আলামিন মিয়া, একজন ব্লগার, ডিজিটাল মার্কেটার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার। ব্লগিংকরছি প্রায় ৭ বছর যাবৎ। বিভিন্ন অনলাইন সেবা হাতের কাছে পেতে নির্দেশনা ও পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করা হয় যা আপনি খুব সহজেই এই ওয়েবসাইট হতে পেতে পারেন। যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য প্রয়োজন হয় বা পরামর্শ থাকে তবে মেইল করুন admin@tricksboss.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *