ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্যানক্রিয়াজের সুস্থতা জরুরি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
ডায়াবেটিস রোগীদের সুস্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্যানক্রিয়াজের (Pancreas) ওপর। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যানক্রিয়াজ সঠিকভাবে কাজ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য প্যানক্রিয়াজের সুস্থতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্যানক্রিয়াজ হলো পেটের ভেতরে পাকস্থলীর পিছনে অবস্থিত একটি গ্রন্থিযুক্ত অঙ্গ। এটি একই সঙ্গে হজম প্রক্রিয়া ও রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, প্যানক্রিয়াজের কার্যক্রমকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়—হজম সহায়ক এনজাইম উৎপাদন এবং হরমোন নিঃসরণ।
হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যানক্রিয়াজ বিভিন্ন ধরনের হজমকারী এনজাইম তৈরি করে, যা খাদ্যকে ভেঙে শরীরের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। এর মধ্যে অ্যামাইলেজ কার্বোহাইড্রেট ভাঙতে সাহায্য করে, লাইপেজ চর্বি হজমে সহায়তা করে এবং প্রোটিয়েজ প্রোটিন ভাঙার কাজ করে। এসব এনজাইম ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছে খাবার হজমের প্রক্রিয়াকে কার্যকর করে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো ইনসুলিন ও গ্লুকাগন নামক দুটি হরমোন উৎপাদন করা। ইনসুলিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমায় এবং কোষে শক্তি হিসেবে গ্লুকোজ ব্যবহারে সহায়তা করে। অন্যদিকে গ্লুকাগন রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেলে তা বাড়াতে কাজ করে। এই দুই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্যানক্রিয়াজ সুস্থ রাখার উপায়
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে প্যানক্রিয়াজের কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে ভালো রাখা সম্ভব।
এ জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত তেল, চর্বি, ফাস্টফুড এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কম খেতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয় পরিহার করা উচিত।
ধূমপান ও মদ্যপান থেকেও দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ধূমপান প্যানক্রিয়াজের বিভিন্ন রোগ এবং প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের ফলে প্যানক্রিয়াটাইটিস বা প্যানক্রিয়াজের প্রদাহের মতো জটিল রোগ হতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যায়ামের গুরুত্ব
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা প্যানক্রিয়াজের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তাই নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা হালকা ব্যায়াম শরীরকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন
ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধ গ্রহণ করলে প্যানক্রিয়াজের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমে।
পর্যাপ্ত পানি পানের পরামর্শ
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। পানি শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
সচেতনতার বিকল্প নেই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। প্যানক্রিয়াজকে সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এসব অভ্যাস অনুসরণ করলে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপন করা সহজ হবে।

