উৎসবের বোনাস বনাম ভবিষ্যৎ : দেদারসে খরচ নাকি সুরক্ষিত সঞ্চয়?
মাস শেষে বেতন, আর তার সাথে যদি যোগ হয় উৎসবের বোনাস—তাহলে সাধারণ চাকরিজীবী থেকে শুরু করে করপোরেট কর্মকর্তা, সবার মনেই আনন্দের হাওয়া বয়ে যায়। কিন্তু এই বাড়তি অর্থ হাতে পাওয়ার পর আমরা ঠিক কী করছি? একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বোনাস হাতে আসার আগেই আমাদের অবচেতন মন তৈরি করে ফেলে খরচের এক দীর্ঘ তালিকা। নতুন জামাকাপড়, গ্যাজেট, রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া কিংবা ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল শোধ করতেই শেষ হয়ে যায় উৎসব ভাতার বড় অংশ।
কিন্তু উৎসবের এই সাময়িক আনন্দের ভিড়ে আমরা কি একবারও ভাবছি আমাদের ভবিষ্যতের কথা? তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক উপদেষ্টারা বলছেন, অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর বিলাসী জীবনযাত্রার এই যুগে আমরা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছি সঞ্চয়ের মানসিকতা, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
ক্রেডিট কার্ডের ফাঁদ ও অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা
বর্তমান শহুরে জীবনে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার যেমন সহজ করেছে কেনাকাটা, ঠিক তেমনি বাড়িয়েছে অযাচিত খরচের প্রবণতা। ‘বাই নাও, পে লেটার’ (এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন) কিংবা আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক অফারের ফাঁদে পড়ে অনেকেই এমন সব জিনিস কিনছেন, যা হয়তো এই মুহূর্তে তাদের কোনো প্রয়োজনেই আসত না। বোনাসের টাকা হাতে পেয়েই এই অতিরিক্ত খরচের বিল শোধ করতে গিয়ে সঞ্চয়ের খাতা থেকে যাচ্ছে শূন্য।
অলক্ষ্যে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি ও চিকিৎসা খরচ
আজকের ১,০০০ টাকার যে মান, আগামী ১০ বা ২০ বছর পর মূল্যস্ফীতির (Inflation) কারণে তা হয়তো অর্ধেক মূল্যে নেমে আসবে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এটি আরও বেশি সত্য। আজ যে খরচ সাময়িক আনন্দ দিচ্ছে, তা মূলত দুর্বল করে দিচ্ছে ভবিষ্যতের রিটায়ারমেন্ট পরিকল্পনাকে।
একটু ভেবে দেখা দরকার—একটা বয়সে গিয়ে যখন নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যাবে, তখন জীবনযাত্রার ব্যয় কিন্তু কমবে না। বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে বর্তমান যুগের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ‘মেডিকেল এক্সপেন্স’ বা চিকিৎসা খরচ। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ, নিয়মিত চেকআপ এবং হাসপাতালের খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়ে। তখন যদি সঞ্চয়ের শক্ত ভিত না থাকে, তবে জীবন হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ।
বিশেষজ্ঞের মতামত: “উৎসবের আনন্দ অবশ্যই উদযাপনের বিষয়, তবে তা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার বিনিময়ে নয়। নিয়মিত আয়ের একটি অংশ এবং বোনাসের অন্তত ৩০-৪০% যদি শুরুতেই সঞ্চয় বা লাভজনক কোনো খাতে বিনিয়োগ না করা হয়, তবে রিটায়ারমেন্টের পর মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
সচেতন হওয়ার এখনই সময়: করণীয় কী?
অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে বের করে এনে সঞ্চয়মুখী জীবন গড়ে তোলার জন্য আর্থিক বিশেষজ্ঞরা কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিয়েছেন:
‘ফিফটি-থার্টি-টুইন্টি’ (50-30-20) নিয়ম: বোনাস বা অতিরিক্ত আয়ের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম খাটানো যায়। ৫০% প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০% উৎসব বা ইচ্ছাপূরণে এবং বাধ্যতামূলকভাবে ২০% থেকে ৩০% ভবিষ্যৎ তহবিলে জমা রাখা উচিত।
ডিপিএস ও রিটায়ারমেন্ট স্কিম: বোনাসের একটি বড় অংশ দিয়ে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি ডিপিএস (DPS) বা পেনিশন স্কিম শুরু করা যেতে পারে।
হেলথ ইন্স্যুরেন্স বা চিকিৎসা তহবিল: বয়স বাড়ার সাথে সাথে চিকিৎসা খরচের যে জোয়ার আসে, তা সামলাতে এখন থেকেই একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি ফান্ড বা হেলথ ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
শেষ কথা
আজকের সঞ্চয়ই আগামী দিনের নিরাপত্তা ও স্বস্তির ভিত্তি। উৎসবের কেনাকাটায় কিছুটা লাগাম টেনে, অপ্রয়োজনীয় খরচের অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সঞ্চয়মুখী হওয়া জরুরি। আজকের একটুখানি সংযম এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগই নিশ্চিত করতে পারে নিজের ও পরিবারের একটি সুন্দর, মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ। তাই বোনাস হাতে পেয়ে খরচের খাতা খোলার আগে, চলুন একবার চোখ বুজে ভাবি আগামীর কথা।

