ক্যাশলেস লেনদেনে গ্রাহকের কোনো চার্জ নেই, মার্চেন্ট ফি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করল বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশে ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে চালু হওয়া বাংলা কিউআর (Bangla QR) পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধে গ্রাহকের কাছ থেকে কোনো ধরনের অতিরিক্ত চার্জ বা ফি নেওয়া যাবে না। ১,০০০ টাকা হোক বা তার বেশি—যেকোনো পরিমাণ লেনদেনেই গ্রাহক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেমেন্ট করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, সামাজিক মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে—এমন যে তথ্য প্রচার করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, যদি কোনো চার্জ প্রযোজ্য হয়, তা শুধুমাত্র মার্চেন্ট বা বিক্রেতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। কোনো অবস্থাতেই সেই চার্জ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
মার্চেন্ট ফি কত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেনে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) সর্বোচ্চ ১ শতাংশ (প্রযোজ্য ভ্যাটসহ) পর্যন্ত হতে পারে। এই ফি গ্রহণকারী ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মার্চেন্টের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে। তবে ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করতে চাইলে তারা নিজস্ব উদ্যোগে প্রচারণামূলক ছাড় বা কম ফি নির্ধারণও করতে পারবে।
গ্রাহকের কাছ থেকে চার্জ নিলে তা অবৈধ
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো দোকানদার বা বিক্রেতা যদি মার্চেন্ট ফি গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করেন বা পণ্যের মূল্যের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ যোগ করেন, তাহলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
কেন চালু হলো বাংলা কিউআর?
‘ওয়ান কান্ট্রি, ওয়ান কিউআর’ ধারণার ভিত্তিতে চালু হওয়া বাংলা কিউআরের মাধ্যমে একটি মাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধ করা যায়। এর ফলে ব্যবসায়ীদের একাধিক কিউআর কোড ব্যবহার করতে হয় না এবং গ্রাহকরাও যেকোনো সমর্থিত অ্যাপ ব্যবহার করে সহজে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।
ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল পেমেন্টে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় না থাকায় বাংলা কিউআর ব্যবহারের আগ্রহ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ধারিত সীমিত সার্ভিস চার্জ ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনা ও সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। তবে বাজারে আস্থা বজায় রাখতে নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং গ্রাহকের কাছ থেকে অবৈধভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ করা জরুরি।
ক্যাশলেস লেনদেনে মার্চেন্ট ফি কি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হওয়া উচিত?
বাংলাদেশে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে অনেকেই মনে করেন, অন্তত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য মার্চেন্ট ফি শূন্য বা অত্যন্ত কম হওয়া উচিত। এতে আরও বেশি দোকানদার ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে উৎসাহিত হবেন। অন্যদিকে ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি হলো, নিরাপদ প্রযুক্তি, সার্ভার, সাইবার নিরাপত্তা, লেনদেন নিষ্পত্তি এবং অবকাঠামো পরিচালনার জন্য একটি যৌক্তিক সার্ভিস ফি প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ক্যাশলেস অর্থনীতিকে সফল করতে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রণোদনা, কর-সুবিধা বা ভর্তুকির মাধ্যমে মার্চেন্টদের ওপর ফি-চাপ কমাতে পারে, তাহলে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার আরও দ্রুত হবে এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

